কাপড়া কফিন
নামটা শুনে বেশ কৌতুহল হয়েছিল , অদ্ভুত নামটা ‘কাপড়া
কাফিলা’ । কলিকাতার গড়িয়াহাট অঞ্চলের কাছাকাছি কোন এক বসতবাড়ীর মধ্যই মনে হল এই
দোকানটি। প্রধানত মেয়েদের বুটীক শাড়ী পাওয়া যায়। এছাড়াও ছেলেদের পাঞ্জাবি ও
অন্যান্য জিনিসও পাওয়া যায়।
‘কাপড়া কাফিলা’ না বলে ‘কাপড়া কফিন’ বললে বোধহয় ভাল হত।
এরকম শ্বাসরোধকারি দোকান আমি আর দুটি দেখিনি। দোকানের ভিতর প্রবেশমাত্র দোকানদার (বা গৃহস্বামী বলাই
বোধহয় ভাল) , ‘হাই’ বলিয়া সম্বোধন করিলন। যে ভদ্রমহিলা এই দোকানটির হত্তাকত্তা ,
ইনি মনে হয় ওনারই স্বামী। পরনে একটি ধবধবে সাদা পাজামা ও সাদা পাঞ্জাবী। একদম ধোপধুরস্ত।
পথে কোনোরকম অসুবিধা বা দোকান চিনতে কোনো অসুবিধা হয়েছে
কিনা ইত্যাদি জানার পর ,একটু যেন করজোরেই ক্ষমা চেয়ে নিলেন, যে ওপরে যেখানে লোভনীয়
শাড়ীগুলি রাখা আছে সেই ঘরের শীততাপ নিয়ন্ত্রনকারী যন্ত্রটি নাকি কাজ করছে না, তাই
আমাদের নাকি খুব কষ্ট হবে। কেমন যেন মনে হল আমরা এখানে মধ্যাহ্ণভোজনের নিমন্ত্রন
খেতে এসেছি,একটু পরেই হয়ত ডিশ ভর্তি খাবার হাজির হবে। ভেবে একটু খুশিই হলাম , কারন আমি একটু পেটুক লোক, খাবার এর
নাম শুনলেই দেহের শিরা-উপশিরায় যেন দোল খেলা শুরু হয়ে যায় আর রক্তকনিকা গুলি ‘হোলি
হ্যায়, হোলি হ্যায়’ বলে লাফাতে থাকে। যদিও খাবারের কোন আয়োজন বা তার আভাষ দেখতে
পেলাম না।
পরমুহুর্তেই হাজির হলেন দোকানের মালকিন, যিনি ‘Hi !!...Sorry for being
late…’ বলে সেই যে ইংরেজীতে
শুরু করলেন , একদম শেষ অবধি টেনে গেলেন। সবাই বাঙ্গালী হওয়া সত্বেও , কোন এক
অজ্ঞাত কারণে উনি সারাক্ষন বিজাতীয় ভাষায় কথা বলে গেলেন। যেটুকু বাংলা মুখ ফস্কে ও
ভুলবশত বেরিয়ে যাচ্ছিল , তা তিনি ‘I mean ..’ বলে শুধরে ইংরিজী করে নিচ্ছিলেন।
যাইহোক শাড়ী দেখতে ওপরে দোতলায় উঠলাম। ভদ্রমহিলা আবার
একপ্রস্থ ক্ষমা চেয়ে নিলেন, আমাদের ঠান্ডা হাওয়া দিতে না পারার জন্য। অনেকরকম রঙ-বেরঙের
শাড়ীতে ভর্তি ওপরটা। বর্নান্ধদের কাছে যেমন সব রঙ ই সমান , আমার কাছেও সব
শাড়ীই একই লাগে। কোনটা যে ভাল আর কোনটা যে খারাপ বুঝতে পারি না। কতরকম তাদের নাম
কতরকম তাদের ডিজাইন।
সেদিন নিউমার্কেটের কাছে একটা বই-এর দোকানে বই ঘাঁটতে
ঘাঁটতে ‘Indian Sarees’ এর ওপর একটা ইয়া মোটা বই দেখলাম। কয়েকটা পাতা উলটে
দেখলুম ,বিভিন্ন সব শাড়ীর গুনগান করা হয়েছে বইটির মধ্যে। তাদের কতরকম ছবি , কিভাবে পরতে
হয় , কোনটা কত লম্বা ও কত চওড়া ,কোন প্রদেশের মহিলারা কি ধরনের
শারী পরেন, সেসব বিশদভাবে লেখা। মনে মনে ভাবলাম , বাব্বা ওই ১২ হাত লম্বা আর ৪ হাত চওড়া ‘ন্যাকরা’ কে নিয়ে এত আদিখ্যেতা কিসের , বুঝি না। লেখক/লেখিকার
নাম দেখতে গেলাম, দেখলাম একটি নয় অনেকজন মিলে লিখেছেন এবং আশ্চর্যজনক
ভাবে সবাই লেখক, একটিও লেখিকার নাম মনে হল না তার মধ্যে। একটু যেন
লজ্জাই হল।
কিছু শাড়ী আগে থেকেই তুলি পছন্দ করে রেখেছিল, সেগুলি নেওয়া
হল এবং (বোধহয়) আরও কিছু নেওয়া হল। সবকিছু নিয়ে আবার নীচে এলাম। মুখের মৃদু হাসিটি
অক্ষত রাখিয়া , ধোপধুরস্ত গৃহস্বামীটি
আবার আমদের আপ্যায়ন করে বসালেন এবং তাঁহার দৃঢবিশ্বাস যে ওপরে আমদের গরমে
খুব কষ্ট হয়েছে সেটি আবার শোনালেন , ক্ষমাও চেয়ে নিলেন।
আথিতেয়তার কোনরকম ত্রুটি নেই। মালকিন বিল তৈরী তে ব্যাস্ত
হলেন। তুলি একটু বলল যদি দাম কিছু কম করা যায় বা কোনরকম discount দেওয়া হচ্ছে কিনা।
মুখে স্মিতহাসি টেনে গৃহস্বামী বলিলেন এখানে ওসব হয় না।
সবকিছুতে একদম ন্যায্য দাম ধার্য করা হয়েছে। ততক্ষনে মালকিনের মুখেও স্মিতহাসি এবং
সেই বিজাতীয় ভাষায় একটু গর্বের সহিত উবাচ... ‘To be honest , no-discount is our
strong point’…তারপর একটু থেমে এবং মুখমন্ডলে একটু দুঃখী ভাব এনে ও
হাল্কা ন্যাকামীর ছোঁয়া দিয়ে...’at the same time , it is our weak point
too!’
যা বাব্বা , একই সঙ্গে একই জিনিস strong point আবার weak point , মাথার ওপর দিয়ে গেল। নিজেই নিজেকে
ধমকালাম ‘ব্যাটা তুই কি সবজান্তা, যে সবকিছু জেনে বসে আছিস?’
যাইহোক মুখে একটা কুলুপ এঁটে রইলাম।
হঠাত করে পরিবেশ টা কেমন যেন চুপচাপ হয়ে গেল। একদম
নিস্তব্ধ। সেটা যে, discount দেওয়া হয় নি তার মনঃক্ষুন্নতার
জন্য, নাকি ন্যায্য দাম ধার্য করা হয়েছে তার খুশিতে, সেটা বোঝা গেল না। কেমন যেন
দম বন্ধ হবার পরিবেশ। যে কথাগুলি খুব মিস করছিলাম সেগুলি মাথা মধ্যে ঘুরপাক
খাচ্ছিল, মুখে আসছিল কিন্তু বলতে পারছিলাম না ’দাদা, ৫০০ টাকা কম করুন...ঠিক আছে
দাদা , আপনার কথাও রইল আমার কথাও রইল ৪৫০ এ রফা করুন...খুব পারবেন দাদা...হবে না
বলে কিছু হয় না দাদা...এই টাকা রইল , দিতে হয় দিন ,নাহলে চল্লুম ভাই’ ইত্যাদি
ইত্যাদি।
এই নিস্তব্ধতার মধ্যে হঠাত করে খসখস করে আওয়াজ শুনতে পেলাম।
ঘাড় ঘুড়িয়ে দেখি তুলি টাকা গুনছে, দেবার জন্য। বাঁ হাতের বুড়ো আঙ্গুল থেকে নোট
গুলো ফস্কাচ্ছে , আর ডান হাতের বুড়ো আঙ্গুল সেগুলি লুফে নিচ্ছে। এখানেও দেয়া
নেওয়ার খেলা।
টাকা মিটিয়ে receipt নিলাম। গৃহস্বামী দাদাটি প্যাকেটগুলি
নিয়ে আমাদের গাড়ি অবধি পৌঁছতে আসছিলেন, ধন্যবাদ জানিয়ে বললাম ,তার দরকার নেই। মনে
মনে বললাম ‘বেরতে পারলে বাঁচি’। এমনিতেই আমি শপিং-বিমুখ তার ওপর আবার এরকম একটা
পরিবেশে কেমন একটু ছটফটানি লাগছিল।
দরজা ঠেলে বেরিয়ে এলাম। তাড়াতাড়ি অথচ সাবধানে গাড়ির দিকে হাঁটা
দিলাম, যাতে না আবার হোঁছট খাই। হয়ত হোঁছট খাবার পরই কানে শুনব ‘কোথাও লাগে নি
তো!’, আর ঘাড় ঘুরিয়ে দেখব গৃহস্বামী দাদা টি দাঁড়িয়ে , হাতে ফার্ষ্ট-এড বাক্স। কে
জানে হয়ত কাচের দরজার ওপার থেকে উনি লক্ষ রাখছেন আমাদের গাড়ি অবধি পদযাত্রা।
গাড়ি তে উঠেই ড্রাইভার কে বললাম তাড়াতাড়ি বেরোতে। মনে মনে
ভাবলাম ‘বেরোতে গিয়ে চাকা টাকা আবার ফেঁসে না যায়।‘ যদি ফাঁসেও, গৃহস্বামী দাদাটি যে স্টেপনি হুইল,
স্প্যানার ইত্যাদি নিয়ে হাজির হবে না, সে বিষয়ে আমি নিশ্চিত। আবার ভাবলাম ,কিছুই
বলা যায় না , হাজির হলেও আশ্চর্য হবার কিছু নাই।
গাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে বাঁক নিতেই ,আড়চোখে (কাপড়া) কফিনের কাচের
দরজার দিকে একবার তাকালাম, মনে হল দুই জোড়া চোখ অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। ‘The Others’ ছবির শেষ দৃশ্যটা মনে পরে গেল ,যেখানে মানুষগুলো বাড়ী হতে বিদায় নিয়ে যখন
চলে যাচ্ছে, তখন সেই বাড়ীতে বসবাসকারী ভুতের ফ্যামিলি (মা ও শিশুরা ) কাচের জানলার
ওপাশে দাঁড়িয়ে ছিল। আতঙ্কে চোখ বুজলাম।
কিছুক্ষন চোখ বন্ধ করার পর হঠাত কানে শুনলাম ‘যা নেবেন একশ
টাকা, পাঁচটা নিলে একটা ফ্রী! যা নেবেন একশ টাকা, পাঁচটা নিলে একটা ফ্রী!... মাল
খারাপ হলে ফেরত হয়..’ ইত্যাদি। স্বস্তির নিঃশ্বাস নিয়ে চোখ খুললাম।
এতক্ষন চারপাশটা ভাল করে দেখি নি, সেই দুপুরে কফিন এ
ঢুকেছিলাম, দুপুর গড়িয়ে বিকেল , তারপর সেই বিকেল গড়িয়ে হাল্কা সন্ধ্যা নেমেছে।
এতক্ষন ছিলাম কফিনের মধ্যে!
গাড়িটা গড়িয়াহাট বাজারের পাশে একটা গলি দিয়ে বেরচ্ছিল।
টুপ-টাপ করে করে বাজারের লাইট গুলি ধীরে ধীরে জ্বলে উঠছে। পশ্চিমের আকাশে একটু
লালচে। সারাদিনের প্রখর উত্তাপে কলিকাতা অর্ধ-সিদ্ধ। যদিও তাকে উপেক্ষা করেই
বাজারে ও রাস্তায় লোক সমাগমের কোন খামতি নেই। ‘সিটি অফ জয়’ নামটি সত্যিই
সার্থক।
আমাদের গাড়ি গলি ছাড়িয়ে বড় রাস্তায় পড়ল।
Disclaimer : ‘কাপড়া কাফিলা’ দোকানটি নিয়ে যা লেখা হয়েছে , তা
নিছকি মজা করেই। কোনরকম ব্যাক্তিগত বিদ্বেষ বা তাকে খারাপ প্রতিপন্ন করা এই
লেখাটির উদ্দেশ্য নয়। দোকানটি খুব-ই ভাল এবং সেখানে লোকেদের ব্যবহার সত্যিই
প্রশংসনীয়। পাঠকদের এখানে যাইতে আন্তরিকভাবে উতসাহিত করি।