মায়াজাল
অমলেন্দু ঠাকুর
গাড়িটা কাছে আসতেই পঞ্চানন এগিয়ে এল। আনিমষ জানলার কাচটা অর্ধেকটা নামাল।
‘আসেন স্যার, আসেন স্যার...নামস্কার ’ - বলে পঞ্চানন হাত দুটো কপালে ঠেকায়। দেখাদেখি অনিমেষ ও হাতটা একটু নিজের কপালের দিকে তোলে।
পঞ্চানন লোকটা মাঝবয়সী, ছিপছিপে চেহারা , সবসময় একটা ঢোলা পাজামা আর খাটো পাঞ্জাবী পরে থাকে। লোকটা খুব কাজের লোক , ওর সাহায্য ছাড়া এই এলাকাতে এই ব্যাবসাটা শুরু করাই সম্ভব হত কিনা সন্দেহ। এর জন্য তুলতুলির বাবাকে, মানে নিজের শ্বশুরমশাই কে অবশ্যই ধন্যাবাদ দিতে হয়। তিনিই পঞ্চাননের সাথে যোগাযোগ করার কথা বলেছিলেন। পঞ্চানন এর মুখে কথার খই ফুটছে সর্বদা। আত্মবিশ্বাসে ভরপুর এবং সর্বদা পজিটিভ কথা বলে। ওর সাথে তাই কথা বলতে ভাল লাগে অনিমেষের, মনে যেন একটা বল পায়।
‘কাজকর্ম সব ঠিকঠাক চলছে তো? কোনো অসুবিধা হলে জানিয়ো, আমি তো সবসময় থাকতে পারি না...’ – অনিমেষ বলল।
‘ও আপনি কিচ্ছু ভাববেন না স্যার, আমি সব সামলে নেব...’ – পঞ্চানন এর ঝটপট উত্তর।
সল্টলেকের এই সেক্টর ফাইভ এর কাছাকাছি রাজারহাট নামক এই জায়গাটাতে ব্যাঙের ছাতার মত হাজার হাজার বাড়ী উঠছে, এইখানেই যে এই ব্যাবসাটা ভাল চলবে সেই পঞ্চাননই বলেছিল। আর জায়গাটাও অনিমেষের ভাল লেগেছিল, একটু বেশ ফাঁকা ফাঁকা, রাস্তাঘাটও বেশ একটু পরিস্কার পরিছন্ন মেন শহরের তুলনায়।
আর এখানে এইসব বাড়ীগুলিতে যেসব দম্পতিরা থাকেন তারা সবসময় ব্যস্ত নিজেদের কাজ নিয়ে, কত কাজ, অফিসের কাজ ছাড়াও পার্টি, ফেসবুক, হোয়াটসাপ ইত্যাদি নিয়ে এত ব্যস্ত থাকেন এনারা যে অনেক সময় নিজেদের যে বংশবৃদ্ধি করতে হবে সেটাও ভুলে যায়। হঠাত করে একদিন হয়ত খেয়াল হল, ‘আরে! বংশে বাতি দেবার তো কেউ নেই! কি হবে!...’ , কিন্তু তখন যা লেট হবার হয়ে গেছে।
তা এইসব পরিবারের লোকেরা যে নিজে হাতে বাসন মাজবে না , সে ত বলাই বাহুল্য। তার ওপর আজকাল কাজের লোকের যা আকাল পড়েছে, তাই বাসন মাজার কারখানাটা এই এলাকাতেই রমরমিয়ে চলবে , তাতে আর আশ্চর্য কি।
হ্যাঁ, তাই এখানে অনিমেষ কুড়ি একর জায়গা কিনে নিয়েছিল, পুরো এলাকাটাকে ছোট ইঁটের পাঁচিল দিয়ে ঘিরে তার মধ্যে চারটে বিশাল বিশাল চৌকোন ঘর বানিয়েছিল, তারপর প্লানমত প্রত্যেকটা ঘরে তিন টে লাইনে সার সার দিয়ে সিঙ্ক আর তার ওপর দিয়ে কলের জলের লাইন বসিয়েছিল। সিঙ্ক গুলো কোমরের হাইটে , সিঙ্ক এর নীচে খোপ খোপ করা, সেখানে বাসন মাজার সাবান, ওয়াশিং স্ক্রাবার গুলি থাকে। অনিমেষ যখন আমেরিকাতে থাকত, তাদের রান্নাঘরেও ঠিক এরকম ব্যবস্থা ছিল, অনেকটা সেই স্টাইলেই বানানো। প্রত্যেক সিঙ্ক এর পিছনে একটি করে প্রশস্ত জায়গা করা আছে, বাসন মেজে রাখার জন্য, তার পরেই আর একটা সিঙ্ক এর লাইন শুরু হয়েছে। এইভাবে তিনটে সারিতে।
অনিমেষের গাড়িটা আর একটু এগিয়ে তার ছোট্ট অফিস ঘর টার কাছে থামতেই, অনিমেষ নেমে পড়ল। বয়সটাযে সত্তর পেরোল বুঝতে পারে, এখন আর হুট বলতে পুট করে কোনো কাজ করতে পারে না। সব কিছুই একটু ধীর লয়ে করতে হয়। রাস্তায় দাঁড়িয়েই জোরে একটা নিশ্বাস নিল। চারটে ঘর থেকেই বাসন মাজার শব্দ আসছে, সাবানের হালকা মিস্টি গন্ধে বাতাসটা কেমন আচ্ছন্ন হয়ে আছে। চোখ বুজে অনিমেষ আর একবার জোরে নিশ্বাস নিল ,তার স্বপ্ন অনেকটাই সফল হয়েছে ... ফিরে গেল সেই আমেরিকার দিনগুলিতে...
‘কি গো, এসেই আবার ল্যাপ্টপ নিয়ে বসে পড়েছ ? সিঙ্ক এর ওপর যে কাল রাতের ডাঁই করা বাসন পত্তর রয়েছে , সেগুলি কে মাজবে ?
মাজা থাকলে রান্নাটা এখুনি শুরু করতে পারতাম, ’ – তুলতুলি একটু রেগেই বলল।
‘ও হ্যাঁ , মাজছি...’ - অনিমেষ বলল।
এই ব্যাপারটা প্রথম দিকের নিত্যনৈমত্তিক ঘটনা ছিল। বাসন মাজতে তার কোনোদিনই ভাল লাগত না। সেই ছোটবেলায় দেখত বাড়ির চাকরানিটা যখন বাসন মাজত ,কিরকম মুখ ব্যাজার করে থাকত। তখন থেকেই মনের মধ্যে একটা ধরণা দানা বেঁধেছিল, বাসন মাজাটা নির্ঘাত একটা বিতিকিচ্ছিরি কাজ, তবুও মাজতে তো হবেই, না হলে কে মাজবে ? এখানে ত আর কাজের লোক নেই! তুলতুলি রান্না করে এবং আরো কত ঘরের কাজকর্ম করে। তাই কাজ ভাগ করা আছে। অনিচ্ছসত্বেও বাসন মাজার কাজটা তার ভাগে এসে পড়েছিল।
কত কম জল ও সাবান খরচা করে অথচ কোয়ালিটি ঠিক রেখে বাসন মাজা যায় ,সেটা যে মাজছে তার কাছে একটা বড় চ্যালেঞ্জ হওয়া উচিত। বাসন মাজার একটা প্রেলুড থাকে যেটা অনেকেই ভুলে যায়। মাজার দুই ঘন্টা আগে কিছু বাসন জলে ভিজিয়ে রাখা অবশ্য কর্তব্য। তাহলে টাফ ময়লা গুলো খুব সহজেই তুলে ফেলা সম্ভব হয় , তাতে জল, সাবান এবং পরিশ্রমও অনেক কম হয়।
ভিজিয়ে রাখা সত্বেও বাসনে কিছু বেয়াড়া ময়লা থাকে, যেগুলি কোনোভাবেই উঠতে চায় না। অনিমেষ এই ব্যাপারটা লক্ষ্য করেছিল এবং এটা নিয়ে একটু পরীক্ষা নিরীক্ষা করে এটা বুঝেছিল যে বাসন এর স্ট্রাকচার অনুযায়ী সেটাকে সিঙ্কের সাথে ৪৫ ডিগ্রী অ্যাঙ্গেলে ধরে যদি ময়লাটির পাদদেশ ধরে একটি টর্ক প্রয়োগ করা যায়, তাতে ময়লাটি অতি সহজেই খুলে আসে। তাহলে বাসন মাজা শুধু আর্টই না, এর মধ্যে লুকিয়ে আছে ফলিত বিজ্ঞান বা অ্যাপ্লায়েড সায়েন্স এর কতকিছু কারিকুরি।
আর একটা অদ্ভুত জিনিস অনিমেষ খুব অনুভব করত, নোংরা বাসনগুলি মাজার পর পরিস্কার করা বাসনগুলির দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তার মনে হত, সে যেন একদন বিপথগামী মানুষকে আবার সমাজের সুস্থ স্বাবাভিক জীবনযাত্রার মূলস্রোতে ফিরিয়ে এনেছে। নিজেকে কেমন একটা সমাজসেবীর মত মনে হত।
তা এহেন কাজটি,যার মধ্যে কিনা শিল্প ও বিজ্ঞানের এক অদ্ভুত সমাহার, সেটা করতে লোকে নাক সিঁটকায় কেন , অনিমেষ বুঝতে পারে না। আসলে অন্যেরা হয়ত সেভাবে কাজটাকে দেখেনি, যেভাবে অনিমেষ এখন দেখে। অন্যেরা শুধু খারাপ জিনিসটাই দেখেছে। আরে বাবা! সব জিনিসের মধ্যেই ভাল খারাপ তো থাকে , সেক্ষেত্রে খারাপ জিনিসটাকে ঘৃণা করার থেকে, ভাল জিনিসটাকে ভালবেসে পু্রো জিনিসটাকে ভালবাসাই তো বুদ্ধিমানের কাজ , যখন কাজটা তোমাকে করতেই হবে।
যাইহোক কি যে হল এরপর থেকে ,মাথায় সবসময় বাসন মাজা নিয়ে চিন্তা ভাবনা ঘুর ঘুর করত। অফিস থেকে বাড়ী গিয়ে কখন সে সিঙ্ক এর সামনে দাঁড়িয়ে নোংরা বাসন গুলি মাজবে , তার জন্য হাতটা নিশপিশ করতে থাকত, অদ্ভুত এক আনন্দ অনুভব করত সে। তখনি সে মনে মনে ভেবে নিয়েছিল , যে এই বাসন মাজা নামক কাজ টাকে একটা লেভেল এ নিয়ে যেতে হবে। আর তখনি মনে এসেছিল যে বাসন মাজার একটা কোম্পানি খুললে কেমন হয়! সে তো এখন বাসন মাজার ব্যাপারে একজন মোটামুটি বিশেষজ্ঞ, কিছু লোককে একটু ফরম্যাল ট্রেনিং দিয়ে কাজ শুরু করবে। শুনতে একটু হাস্যকর শোনাবে বটে,যে বাসন মাজার ওপর আবার ট্রেনিং! কেউ কেউ হয়ত শুনে ভিরমীও খাবে, এ আবার কি রে বাবা! এতো বাপের জন্মেও শুনিনি, কিন্তু অনিমেষের মনে হয় এটার দরকার আছে, আপাতদৃষ্টিতে বাসন মাজা হেলা ফেলার কাজ মনে হলেও , এটা যে তা নয় এবং এর মধ্যেও যে কতটা গভীরতা আছে , সেটা ফরম্যাল ট্রেনিং দিলেই কর্মচারীরা বুঝতে পারবে।
তুলতুলি ব্যাপারটা ধীরে ধীরে বুঝতে পেরেছিল, দোষটা অনিমেষেই, বাসন মাজার ওপর ভালবাসাটা ওর এমন একটা লেভেল এ পৌঁছেছিল যে ও সবসময় ডান পকেটে একটা স্ক্রাবার ও বাঁ পকেটে একটা ছোট্ট সাবানের শিশি রাখত। একদিন অফিস থেকে ফিরে এক ঘনিষ্ঠ মুহুর্তে তুলতুলি সেগুলি দেখে ফেলে। সেই প্রথম তুলতুলি বুঝতে পারে তার বাসন মাজাকে ঘিরে তার স্বামীর কিছু একটা ব্যাপার চলছে।
‘এমা! পকেটে সাবান,ছোবড়া কেন? এ আবার কি ? তুমি কি পাগল!?’ – তুলতুলি বেশ উতকন্ঠার সাথে বলেছিল।
‘কেন!, ডাক্তার রা যেমন গলায় স্টেথো রাখে, পুরোহিতরা যেমন নামাবলী গায়ে জড়িয়ে রাখে, মেকানিকরা যেমন কাছে সবসময় স্ক্রুড্রাইভার রাখে ,সেরকম আমিও সাবানের শিশি আর বাসন মাজার ছোবরা রাখি, কারণ এটা আমাকে প্রায়ই করতে হয় তাই! এবং আমি এটা ভালবাসি তাই...এতে আসুবিধার কি হল ?’ – অনিমেষ উত্তর দিয়েছিল।
‘তুমি একটা পাগল!’ – তুলতুলি হতভম্ব হয়ে বা কি বলবে ভেবে না পেয়ে বলেছিল।
শুধু যে নিজের বাড়ীতেই সিঙ্ক এ নোংরা বাসন দেখলে হাত নিশপিশ করত তাই নয়, কোনো বন্ধুদের বাড়ীতে হয়ত গেছে নিমন্ত্রনে, সেখানে তাদের রান্নাঘরে নোংরা বাসন পত্তর দেখলেও ভিতরটা কেমন যেন ছটফট করে উঠত। ইসস! এগুলি যদি মাজা যেত! একবার একজনের বাড়ী তে গিয়ে মেজেও ছিল কয়েকখানা বাসন, সবার আলক্ষ্যে।
পকেটে তো সরঞ্জাম থাকেই সবসময় , অনিমেষের আবার নিজস্ব পছন্দের কিছু স্ক্রাবার ও সাবান আছে, অন্য ব্রান্ড তার আবার অত পছন্দ না। তাই নিজের ব্রান্ডটা সে নিজের পকেটে রাখতেই পছন্দ করে। সুপারমার্কটে গেলেই অনিমেষ দেখে আসে নতুন কোন ভাল বাসন মাজার সাবান বা ওয়াশিং স্ক্রাবার এল কিনা। তবে তুলতুলি একবার দেখে ফেলার পর অন্যের বাড়ী গিয়ে রান্নাঘরে প্রবেশ একদম নিষিদ্ধ করে দিয়েছে।
‘স্যার , একটু চা আর জলখাবার এনেছি, ভেতরে আসুন, বাইরে যা গরম!...’ – পঞ্চাননের ডাকে সম্বিত ফিরে পায় অনিমেষ।
‘হ্যাঁ, চল...’ অনিমেষ বলে, যদিও গরম টা তার কোনো সমস্যা নয়। ঠান্ডার থেকে উত্তাপ তার ভাল লাগে। অফিসএর চারদিকে সুন্দর করে কিছু কিছু জায়গায় পঞ্চানন লোক লাগিয়ে ফুলের বাগান করিয়েছে, খুব সুন্দর লাগছে। অনিমেষ ভিতরে এসে বসে। চা খেতে খেতে অফিসের কিছু কাগজ পত্তর দেখে নেয়, কয়েকটা চেক এ সাইন করে। পঞ্চাননের সাথে টুকিটাকি কথা হয় কাজের ব্যাপারে। পঞ্চানন লোকটা আগে ধোবি গিরি করত। সবার কাপড় কাচত। তাই মনে হয় ও বাসন মাজার ব্যাপারটা এত ভাল বোঝে। আসলে যদি দেখা যায় ,কাপড় কাচা আর বাসন মাজার মধ্যে নীতিগতভাবে অনেক মিল। যদি বলা হয় ‘বাসন-কাচা’ বা ‘কাপড়-মাজা’, কথাটা খটমট শোনালেও, খুব একটা ভুল না। ধোবিরা যেমন প্রতেকজনের কাপড় আলাদা আলাদা করে ট্যাগ করে, যাতে এর জামা ওর ঘারে না চলে যায়, এখানে বাসন মাজার ক্ষেত্রেও সেরকম করতে হয়। পঞ্চানন কিছু কর্মচারী কে ট্রেনিং দিয়ে দিয়েছে, কিভাবে সেগুলি করবে। কাজটা একদম ছেলেখেলা না, এই হাজার হাজার বাসনের মধ্যে কোন লোকের কোনটা বাসন সেটা ঠিকঠাক চিহ্ণিত করতে না পারলে, পুরো ব্যাপারটাই ভোগে চলে যাবে।
পাঁচটা ছোট ছোট ট্রাক অনিমেষ ভাড়া নিয়েছ, সেগুলি ভোরবেলা বেরিয়ে যায়, বাড়ী বাড়ী গিয়ে এঁটো-কাঁটা বাসন সংগ্রহ করে কারখানা তে ফিরে আসে। তারপর সেগুল ট্যাগিং হয়, প্রিওয়াশ হয়ে মাজার কাজ শুরু হয়। মাজা হয়ে গেলে ড্রাই করা হয় , বিকেলের দিকে সব আবার ফেরত যায় যার যার বাড়ীতে। এটা অবশ্য দুই খেপে হয়, পরের খেপের গাড়িগুলো একটু দুপুরের দিকে যায় আবার যায় সন্ধের দিকে। প্রথম কয়েকটা বাড়ী ছিল, ধীরে ধীরে এখন আনেক বাড়ী বেড়েছে। সেইজন্য এখন কাজের চাপও বেশি।
প্রত্যেক সপ্তাহে একবার সব কর্মচারী দের নিয়ে একটা মিটিং হয়। অনিমেষ সেখানে একটু বাসন মাজা নিয়ে কথা বলে। এই যেমন বাসন মাজা নিয়ে সারা দুনিয়াতে মানুষের সচেতনতা বা awareness, নতুন নতুন কি কি সম্ভবনার কথা এবং আরও নানারকম টেকনিক্যাল কথাবার্তা ,সবই বাসন মাজা নিয়ে। কর্মচারীরা শুনে খুবই উতসাহিত হয়। অনিমেষের ভাল লাগে। তাদের কথাও অনিমেষ মন দিয়ে শোনে। বাসন মাজতে গিয়ে কারোর কোনো সমস্যা হলে বা কোথাও কিছু বুঝতে অসুবিধা হলে সেগুলো ভাল করে বুঝিয়ে দেয়। যদিও প্রত্যেক কর্মচারী বুক পকেটে বাসন মাজার কুইক রেফারেন্স গাইড থাকে, তবুও অনেকসময় কিছু কিছু জিনিস বই পড়ে ত হয় না! অনিমেষ সেটা বোঝে। অনিমেষ আজ এসেছে সেই সাপ্তাহিক মিটিং সারতে। জলখাবার টা খেয়ে চেয়ারে গা টা একটু এলিয়ে দিল, ভেবে নিল কি কি বলবে আজ। তারপর আবার সেই পুরোন দিনের আমেরিকার ঘটনাগুলো মাথায় আসতে লাগল।
‘আরে আমি কি বাসন মাজব নাকি ? আমার আন্ডারএ কর্মচারীরা মাজবে...’ – অনিমেষ বোঝানোর চেষ্টা করেছিল।
‘ওই একই হল, দেশে আমাদের আত্মীয়স্বজন প্রতিবেশীরাই বা কি বলবে ? সবাই বলবে তুলতুলির বর তো দেশে ফিরে এসেছে , এখন বাসন মাজে... সেটা কি খুব শুনতে ভাল লাগবে ?’ – তুলতুলি প্রচন্ড উত্তাপ এর সাথে কথাগুলি বলেছিল।
অনিমেষের মনে পড়েছিল সেই এক অনুপ্রেরনীয় বক্তার কথা, কোন বড় কাজের নামার আগে সবথেকে যেটা প্রথমেই বাধার কারন হয়ে দাঁড়ায় ‘সবসে বড়া রোগ, কহেঙ্গে কেয়া লোগ’ , এই রোগটাকে না কাটাতে পারলে , কিছুই করা যাবে না।এর পরের দিকের ঘটনা গুলি খুব সুখকর ছিল না। প্রায়শই ঝগড়া লেগে থাকত। দুই বাড়ী থেকেই প্রবল আপত্তি ছিল, অনেকে বলেছিল ‘সুখে থাকতে ভুতে কিলোয়!’
কিন্তু অনিমেষ প্রতিজ্ঞা করেছিল সে যাবেই, বাকি জীবনটা সে বাসন মাজা নিয়ে থাকতে চায়। একথা শুনে সবাই হেসেছিল। আমেরিকার বন্ধুরাও প্রবল আপত্তি জানিয়েছিল। কেউ মেনে নিতে পারে নি। হ্যাঁ দেশে অনেকেই ফিরে যায়, একই প্রফেসেনে থেকে আরো ভাল পদে চাকরী পেয়ে, ওদেশের অনেক অসুবিধা থাকা সত্বেও , কিন্তু বাসন মাজার কম্পানি বানানোর এই উদ্ভট পরিকল্পনা নিয়ে দেশে ফেরাটা কেউই ঠিক মেলাতে পারছিল না। সবাই ভেবে নিয়েছিল অনিমেষের মাথাটা পুরোটা না হলেও কিছুটা যে বিগড়েছে তাতে সন্দেহ নেই।
সবার আপত্তি থাকা সত্বেও শেষমেষ অনিমেষেরই জিত হয়েছিল। তুলতুলির ওর সাথে অনেকদিন কথা বন্ধ করে দিয়েছিল। আমেরিকার বন্ধুবান্ধবদের ছেড়ে আসাটা একদমই সুখকর ছিল না তুলতুলির কাছে। অনিমেষেরও কি ভাল লেগেছিল ছাই! কিন্তু কি করবে বাসন মাজা তাকে এমনভাবে অনুপ্রানিত করেছিল যে সে সেটাকে নিয়ে কিছু একটা করবার জন্যই তো দেশে যাবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তবে এখানে এসে নিজের পরিবার পরিজন কে কাছে পেয়ে তুলতুলি ধীরে ধীরে আবার শান্ত হয়ে গেছিল।
সময় সবাইকে অদ্ভুতভাবে চুপ করিয়ে দেয়!
ফিরে যাওয়াটা যখন ঠিকই হয়ে গেছিল, তখন তার শ্বশুড়মশাই মানে তুলতুলির বাবা অনেক সাহায্যা করেছিল কম্পানি খোলার প্রাথমিক কাজকর্মের ব্যাপারে।
ছেলেটার এখানে এসে প্রথম প্রথম একটু অসুবিধা হয়েছিল বটে, পরে সব ঠিক হয়ে গেছিল। সে উচ্চতর গবেষনার সুত্রে এখন আমেরিকাতেই থাকে। ওখানেই হয়ত স্থায়িভাবে থাকবে, যদি না বাপের মত মাথায় বাসন মাজার বা অন্যকোন ভুত চাপে। তুলতুলি প্রতিজ্ঞা করেছে , ছেলের বিয়ে দেবার আগে বউকে দিয়ে প্রতিজ্ঞা করিয়ে নেবে যে বাসন যেন ছেলেকে দিয়ে না মাজায়। হয় বউ মাজবে , বউএর অসুবিধা থাকলে অন্যা কোন লোক রাখবে। অনিমেষ ও তুলতুলি মাঝে মাঝে ছেলেকে দেখে আসে আমেরিকাতে গিয়ে।
‘স্যার , সব রেডি’ – পঞ্চাননের ডাক দিল দরজা থেকে।
অনিমেষ মিটিং রুমে যাবার জন্য উঠে পড়ল। ওর অফিস এর পিছনেই একটা মোটামুটি বড় হলঘর মত আছে। সেখানে অনেক চেয়ার পাতা আর তাদের সামনে একটা টেবিল ও চেয়ার, যেটাতে অনিমেষ বসে। বসে বসেই বক্তৃতা, কথাবার্তা ইত্যাদি চলতে থাকে।
অনিমেষ ঘরে প্রবেশ করতেই সকলে দাঁড়াল। ‘বস, বস...’ – অনিমেষ হাত তুলে সবাইকে বলল। সবাই আবার বসে পড়ল। কিছুক্ষন একটু চুপচাপ...
‘তোমরা কি তোমাদের ঘরেতেও বাসন মাজো ?’ – অনিমেষ সবার উদ্দেশ্যে বলল।
‘হ্যাঁ, মাজি , স্যার’ – অনেকেই বলল।
‘বাহ! ...তা বাসন মাজাতে কোন ত্রুটি হলে তোমরা কি তোমাদের স্ত্রী র কাছে কখন বকা খেয়েছ বা তার রক্তচক্ষু দেখেছ ?’ – অনিমেষ বলল।
‘হ্যাঁ স্যার , মাঝে মাঝে বকা খাই, রক্তচক্ষুও দেখতে হয়’ - বেশীরভাগ কর্মচারীই উত্তর দিল।
‘বাহ খুব ভাল কথা, এটাকে একেবারেই খারাপ ভাবে নেবে না, এই রক্তচক্ষুই তোমাদের বর্তমান পেশাটাকে আরো উন্নতি করতে সাহায্য করবে...’ – অনিমেষ আরো অনেক কিছু বলতে থাকে।
..... ...
মিটিং শেষ হতে আজ একটু দেরিই হল। যাইহোক পঞ্চাননের সাথে আরো কিছু কাজের কথা সেরে অনিমেষ যাবার জন্য তৈরি হল। গাড়ী এসে গেছে। গাড়ীতে উঠে বসল অনিমেষ।
গাড়ী চলতে শুরু করেছে , মেন গেটের কাছাকাছি আসতেই দেখল , দ্বিতীয় খেপের একটা ট্রাক ঢুকছে, পিছনে বোঝাই করা নোংরা বাসন-কোসন। মালিকের গাড়ী চোখে পড়তেই ট্রাক চালক একটু জোরেই ব্রেক মারল বোধ হয়, সাথে সাথে ট্রাকটাতে একটা ঝাঁকুনি হল, একটা নোংরা বাসন ছিটকে বেরিয়ে পড়ে গেল পিছনের ডালা থেকে, ঝন ঝন আওয়াজ করতে করতে বাসনটা অনিমেষের গাড়ীর দিকেই আসতে লাগল। কি আওয়াজ রে বাবা!...
বৃদ্ধ ফুটবল খেলোয়াড় যেমন মাঠে তরুনদের খেলা দেখলে পাদুটো নিশপিশ করে ওঠে, নোংরা বাসন দেখে এই বৃদ্ধ বয়সেও অনিমেষেরও হাতটা আবার নিশপিশ করে উঠল, নিজের অজান্তেই হাতটা ডান পকেটে চলে গেল বাসন মাজার স্ক্রাবারটা খুঁজতে...বাসন নিজে আর সে মাজে না আজকাল...তার প্রিয় জায়গা সিঙ্ক থেকে সে আজকাল দূরেই থাকে... একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল অনিমেষ...যাইহোক বাসনটা গড়িয়ে গড়িয়ে তার গাড়ীর একদম সামনে এসে স্থির হল, অনিমেষের গাড়ীও ইতিমধ্যে দাঁড়িয়ে গেছে...কিন্তু আওয়াজ টা ত থামছে না! কি ব্যাপার ? কানের কাছে ঝনঝনানি আওয়াজ টা বেড়েই চলেছে...আরে! এই আওয়াজটা এবার অনেকটা তুলতুলির গলার মত শোনাচ্ছে কেন!...একটা ঠেলা অনুভব করল...কি ব্যাপার রে বাবা!...এবার পরিস্কার কানে কাছে শুনতে পেল...
‘কি গো , কি ভাবছ তখন থেকে বাইরের দিকে তাকিয়ে ? বাসন টা তাড়াতাড়ি মেজে আমাকে এবার উদ্ধার কর...সিঙ্ক টা খালি করে আমাকে এবার কাজ করতে দাও, একটু পরেই লোক আসা শুরু হবে, অনেক কাজ পড়ে আছে এখনো...’ - পরিস্কার তুলতুলির গলা।
অনিমেষ এক ঝটকায় বাস্তবে ফিরে এল। একি! কোথায় তার সাধের কারখানা! কোথায় পঞ্চানন!...সে তো আমেরিকাতে তার বাড়ীর রান্নাঘরের সিঙ্ক এর সামনে দাঁড়িয়ে! ডান হাতে সাবানজল সিক্ত নীল রঙের প্রিয় স্ক্রাবার টি ধরা...ট্যাপ থেকে টুপ টুপ করে জল পরে চলেছে।...আর সেও মোটেই সত্তর পার করা বৃদ্ধ না...চল্লিশ পার করা টগবগে যুবক...
‘অ্যাঁ? অ্যাঁ...হ্যাঁ...হ্যাঁ...এই আর পাঁচ মিনিট’ – অনিমেষ একটা প্রচন্ড ধাক্কা খেয়ে উত্তর দিল।
‘সেই কখন থেকে দেখছি , সামনের জানলার দিকে তাকিয়ে কি যে ভেবে চলেছ, তাড়াতাড়ী কর তো এবার...’ – তুলতুলি অসহিষ্ণু ভাবে বলে।
অনিমেষ বাসন মাজায় মন দিল। এতক্ষন যেটা তার চোখের সামনে ভাসছিল, সেটা কি জীবন্ত ছিল! ভাবতেই পারছে না যে ও এটা এতক্ষন ধরে কল্পনা করছিল! তার মনের মধ্যে আগে এরকম একটা চিন্তা ছিল না যে তা নয়, কিন্তু এত বিস্তারিত ভাবে কোনদিন ভাবে নি ...কেমন একটু হতভম্ব হয়ে রইল,কল্পনার মায়াজালে যেটা সম্ভব ছিল,বাস্তবে কি এটা রুপায়িত করা যাবে ?। তুলতুলির সাথে একবার কথা বলবে ওর এই ভাবনাটা নিয়ে? ও কি মানবে ?...যদিও না মানার সম্ভবনা টাই বেশী...তবুও বলতে দোষ কি? তাছাড়া কল্পনাতে ও নিজে যেমন দৃঢপ্রতিজ্ঞ ছিল , বাস্তবে কি সেভাবে পারবে? একটা দ্বিধাদ্বন্দের মধ্যে মনটাকে দোদুল্যামান রেখে এবং বাসন মাজা শেষ করে সিঙ্কের কাছ থেকে তথা রান্নাঘর থেকে বের হল অনিমেষ।

No comments:
Post a Comment