Thursday, February 4, 2016

উদরাময়োপাখ্যান

উদরাময়োপাখ্যান  

অমলেন্দু ঠাকুর  


‘এবারে দেশে গিয়ে কিন্তু ওই লোকাল ট্রেনে করে হাওড়া থেকে বর্ধমান যাব, আর যত খাবার দাবার উঠবে সব খাব। খুব মজা হবে‘ - তুলতুলি চোখ বড় বড় করে  বলল।

‘হুম...কতদিন পরে আবার ওই ট্রেনে চাপব!’ – অম্বরও বলে , একটু থেমে আবার বলে  ‘শুধু একটাই অসুবিধা এই ট্রেন এর মধ্যে কোনো টয়লেট থাকে না, নিম্নচাপ পেলে একটু কেলো ব্যাপার’।

‘দু ঘন্টার ত ব্যাপার! তোমার মাথায় খালি আজেবাজে চিন্তা...’ – তুলতুলি বলে।

‘চাপ পেলে এক মিনিটই মনে হয় যেন এক ঘন্টা , দু ঘন্টা তো খুবই বিপজ্জনক।  আমি যে ঘরপোড়া গরু ,তাই সিঁদুরে মেঘ দেখলে একটু ভয় পাই’  - অম্বর গম্ভীরভাবে বলে। 

ইন্ডিয়া যেতে এখনও দেরি আছে বেশ কয়েকদিন, যদিও এই সময়টাই অম্বরের বেশ ভাল লাগে, বেশ একটা একটা যাব যাব ভাব। গেলেই তো ফিরে আসার পালা। আবার সেই গতানুগতিক জীবনের মধ্যে ঢুকে পড়া।

সবই ভাল কিন্তু এই সুটকেস প্যাকিং জিনিস্টা অম্বরের কাছে খুবি বিরক্তিকর লাগে। তুলতুলি খুব উৎসাহের সাথেই করে। নিজের গা বাঁচাতে অম্বর তাই মাঝে মাঝে বলে ‘জানো তো , এই প্যাকিং জিনিসটাও কিন্তু একটা আর্ট! সবাই এটা পারে না !’  

‘এবারে আমরা যেদিন পৌঁছব , সেদিন কি জা্নো ত ?’ – তুলতুলি বলে।
-       ‘কি ? না তো ...’  
-       ‘জামাইষষ্ঠী! , মা কিন্তু অনেক কিছু রান্না করবে বলেছে’
-       ‘ও, তাই নাকি? দারুন ত!’   
অম্বর মুখে খুব উল্লসিত দেখালেও ভিতরে অতটা হয় না। দেশে গেলে  খাওয়া দাওয়ার যা বহর প্রতেকদিনই মনে হয় জামাইষষ্ঠী। কিন্তু মুখে কিছু বলে না।

----

প্লেনটা ভোরের দিক করে কলকাতায় নামল। নামার ঠিক ঘন্টাখানেক আগে একটা ব্রেকফাস্ট দিয়েছিল প্লেনে। দারুন লেগেছিল অম্বরের খেতে, তুলতুলি পুরোটা খেতে পারেনি, অম্বর ওরটাও সাবড়ে দিয়েছে।  তার ওপর এক গ্লাস জল মেরে পেটটা বেশ একটু চাপ চাপই লাগছে।  
তুলতুলিদের বাড়ী পৌঁছে, চান করে জামাইষষ্ঠীর জন্য রান্না করা লোভনীয় সব খাবার খেয়ে অম্বর শরীরটা একটু এলিয়ে দিল। পেটটা একটু থম্‌ মেরে থাকলেও  সুস্বাদু খাবারের লোভ সারাজীবন অম্বরকে পরাজিত করে এসেছে, এবারেও তাই তার ব্যতিক্রম হয় নি, তাই পেটের কথা চিন্তা না করে , নিজের সাধ্যমতো যতটা পেরেছে সাবড়েছে।

হালকা নিদ্রা নিমেষে গ্রাস করে নিল অম্বরকে।
---
তুলতুলির ধাক্কা আর ডাকাডাকিতে ঘুম ভেঙ্গে গেল...’এই ওঠ, ওঠ , এবার তৈরী হয়ে নাও, বেরোতে হবে, গাড়ী এসে গেছে, হওড়া যাব, ওখান থেকে ট্রেন...’

পাঁচ দশ মিনিট লাগল সবকিছু করে তৈরী হতে। তৈরী হতে হতে অম্বর বুঝতে পারল তার পেটের মধ্যে সেই থম্‌ মারা অবস্থাটা এখনো বর্তমান। তলপেটের নিচের দিকে হালকা ব্যাথা । তাই বেরনোর আগে একবার বাথরুমে ঢুকল। ভিতর থেকে শুনতে পেল, তুলতুলি বলছে ‘তোমার এই বেরনোর আগে যত্তসব...’

অম্বর বসে বসে কয়েকবার নিচের দিকে ঠেলা মারল, কিন্তু কিছুতেই কিছু হল না। বাইরে থেকে তুলতুলি আবার তাড়া দিচ্ছে। তাই অম্বর আর দেরী না করে শেষবারের মত, একখানা জমপেশ করে ঠেলা মারল , শুধু ‘ঠুস্‌সস..’ শব্দযোগে কিঞ্চিত বায়ু নির্গত হল মাত্র, যেটা অম্বরের একেবারেই মনঃপুতঃ হল না।  

--

হাওড়া স্টেশন এ পৌঁছে ওরা একটা কর্ড লাইন এর লোকাল ট্রেন এ চড়ে বসল। দারুন লাগছিল অম্বরের, দু একটা স্টেশন পরে, চারিদিকের শহুরে ভাবটা কেটে গেল, এখন জানলার পাশ দিয়ে শুধু মাঠ , ঘাট, খাল , বিল, ছোটো ছোটো গ্রাম, শহরতলীর দোকানপাট সরে যেতে থাকল।

‘এই  মুড়ি এলে নিও কিন্তু দুটো, ট্রেন এর ঝালমুড়ি  নাকি দারুন বানায়’ – তুলতুলি বলে।

‘হুঁ , নেবো ‘ অম্বর বলে।

 একটু থেমে আবার আস্তে আস্তে তুলতুলির কানে কানে বলে  ‘একটা কি সুন্দর গন্ধ দেখেছ  হাওয়াতে! , এই বাইরেরে মাটি , ঘাষ , আম , কাঁঠাল, কচি ধান, খালের আধপচা জল, আর তার সাথে ট্রেন এর লাইন আর তার পাশে পাথর , প্রখর রোদ্দুর  আর তার উত্তাপ ...সব মিলে কেমন একটা গন্ধ তৈরী হয়েছে বতাসে , বুঝতে পারছ ?’

‘বা...ব্বা! হল কি তোমার  ? তুমি আবার এসব গন্ধ কবে থেকে পেতে শুরু করলে ? এদিকে ঘরে বাথরুম দীর্ঘদিন পরিস্কার না করায় যখন নোংরা গন্ধ বেরোয়, সে গন্ধ ত পাও না! কারণ পরিস্কার টা তোমাকে করতে হবে বলে। ...তখন ত বল... ‘কই  আমি ত কোনো গন্ধ পাচ্ছি না’ ‘  – তুলতুলি আস্তে চেপে চেপে বলে।

অম্বর আর কথা বাড়াল না বেশ কিছু লোক ইতিমধ্যে ঢুলতে শুরু করেছে, কিছু লোক দরজার সামনে দাঁড়িয়ে গল্পে মত্ত। একটা ছাত্র-ছাত্র দেখতে ছেলে আস্ত একটা বাই-সাইকেল নিয়ে উঠে অন্য দিকের দরজার পাশে দাঁড়িয়ে।  

কাঁচা সরষের তেলের গন্ধ নাকে এল অম্বরের।

 ‘মুড়ি ঝাল...ঝাল মুড়ি...মুড়ি বলেন...’ বলতে বলতে একটা রোগা প্যাটকা ছেলে কামরার অপর প্রান্ত এদিকটাতে এল , বুকে ঝালমুড়ি তৈরীর যাবতীয় কাঁচামাল ঝোলান।

‘আমার পেটটা বেশ সুবিধের মনে হচ্ছে না, একটাই নিচ্ছি’ – অম্বর বলল।

‘ধ্যাত্তেরিকা...তোমার এই এক হয়েছে’ – তুলতুলি খুব্ধ হয়ে বলে।

একটা প্যাকেট নিয়ে অম্বর একটু খেল , বাকিটা তুলতুলি কে দিল।  

অম্বরের খুশি খুশি ভাবটা ধীরে ধীরে কেমন যেন উবে যেতে থাকল। কিছুক্ষন পরে বুঝতে পারল, এটা তার পেটের জন্য। পেটের ‘চিনচিনে’ ব্যাথাটা এবার মনে হল ‘মোচড়ে’ রুপান্তরিত হচ্ছে। এই ট্রেনে আবার কোনো বাথরুম নেই না, কথায় বলে না! ‘যেখানে বাঘের ভয় , সেখানেই সন্ধ্যা হয়’। কিছু বিশ্রী পূর্ব অভিজ্ঞতার কথা স্মরন করে অম্বরের ভিতরে ভিতরে কেমন ভয় লাগল।   

 ‘কিগো , শরীর ঠিক আছে তো?  কেমন একটা করে বসে আছ ‘ – তুলতুলি কিছুক্ষন পরে বলল।

‘না ,মানে ওই পেটটা একটু সমস্যা করছে...’ – অম্বর বলল , কথা বলতে তার একটুও ভাল লাগছিল না, কথা বললে যেন পেটের মোচর টা বাড়ছে।

‘সেকি? নেমে যাবে পরের স্টেশনে ? তারপর কম্মো সেরে পরের ট্রেন ধরব।‘

‘না , দেখা যাক ‘

এখনো বর্ধমান পৌঁছতে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ মিনিট দেরী আছে। এতক্ষন আটকে রাখা যাবে কি ? অম্বর চোখ বন্ধ  করে অন্য কিছু চিন্তা করতে চেষ্টা করল। তুলতুলিও একটু আপসেট হয়ে পড়েছে মনে হচ্ছে। বেচারী ট্রেনে কতকিছু  খাবে বলে প্লান করেছিল

এদিকে যত সময় যেতে শুরু করল অম্বরের অবস্থাও আরও সঙ্গিন হতে থাকল। লোকজনের কথাবার্তা, হকারদের আনাগোনা, ট্রেন স্টেশনে থামলে যাত্রীদের চিৎকার চেঁচামেচি তার কিছুই মাথাতে ঢুকছিল না। বরঞ্চ তাতে আরও পাগল পাগল লাগতে শুরু করল।  
ট্রেনটা মাঝে মাঝে উপরে নীচে দুলছে, এই দুলুনিটা কি ভাল লাগত অন্য সময় হলে। এখন এটা মনে হল অসহ্য। বেশি দুললে ভয় হয় এই বুঝি অঘটন ঘটে। ব্যাথাটা ধাপে ধাপে বাড়ছে।

গাংপুর ছাড়ল, এরপরই বর্ধমান। অম্বরের প্রায় দমবন্ধ অবস্থা। তুলতুলিও কোনো কথা বলছে না ,অম্বর মনে মনে একটা প্লান করে নিল, বর্ধমানে ট্রেন থেকে নেমে কি করবে।

তুলতুলিকে বলল ‘শোনো , জানি না কত নম্বর প্লাটফরমে আমাদের ট্রেন দাঁড়াবে, যেখানেই দাঁড়াক না কেন, নেমেই আমি সোজা এক নম্বর প্লাটফরমের দিকে যাব, ওখানে একটা টয়লেট আছে 
‘ঠিক আছে’– তুলতুলি বলে।

‘তুমি ওখানেই অপেক্ষা কোরো। , আমি ওখানেই ফিরে আসব।‘ – অম্বর বলল।  পা দুটো কেঁপে কেঁপে উঠছে অম্বরের।

তুলতুলিকে বলল ‘সব লোক আগে বেরিয়ে যাবে, তারপর বেরব, ধাক্কাধাক্কিতে অঘটন হতে পারে‘

পাঁচ নম্বরে ঢুকেছে ট্রেন।  

ওভারব্রীজে অসম্ভব ভীড়, পিলপিল করে লোক উঠছে  আর  নামছে , এক নম্বরে পৌঁছতে পারলে হয়! মনে পড়ল একবার বিদ্যাসাগর মহাশয় মায়ের সাথে দেখা করার জন্য একটা গোটা নদী সাঁতরে পেরিয়েছিলেন,স্রেফ মনের জোরে, মায়ের টান বলে কথা। তাকেও পারতে হবেবিড়বিড় করে বলল ‘বিদ্যাসাগর মহাশয়ের তলপেটের নিচের দিকে তো আর জীবানুতে মরণকামড় দিচ্ছিল না, দিলে উনি বুঝতেন কত ধানে কত চাল’

জনসমুদ্রের মধ্যে সাঁতরে যখন এক নম্বরে এল, তখন দেখল প্রায় অক্ষতই আছে। অম্বর সময় নষ্ট না করে  তাড়াতাড়ি টয়লেটের
জায়গাটা খুঁজতে শুরু করল

অবশেষে খুঁজে পেল সেই বহু আকাঙ্খিত জায়গা। লেখা আছে ‘এখানে পয়সা দিয়ে পায়খানা ও প্রস্রাব করা হয়’
 
ঢোকার মুখে পয়সা দিতে যাবে , ছেলেটি জিজ্ঞেস করল - ‘সলিড না লিকুইড ?’
   
‘অ্যাঁ ?’ ... কি বলছে  অম্বর হঠাৎ করে বুঝে উঠতে পারল না। পরক্ষনেই বুঝতে পারল কি বলতে চাইছে লোকটি।  সেন্স অব হিউমার আছে ছেলেটার বলতে হবে, যাইহোক ,হবে তো লিকুইড, কিন্তু যেতে হবে সলিডের জায়গায়, ওকে নিশ্চই অত ভেঙ্গে বলার দরকার নেই

‘সলিড , ভাই ’ – অম্বর বলল।

‘পাঁচ টাকা ‘ – লোকটি বলল।

অম্বরের এখন যা অবস্থা , পাঁচ টাকা কি , পাঁচ হাজার টাকাও দিতে রাজী আছে ওই নোংরা তিন ফুট বাই তিন ফুট ঘরে কিছুক্ষন বসতে পারার জন্য।

টাকা মিটিয়ে ভিতরের দিকে এগোল অম্বর। আর এক সেকেন্ডও মনে হচ্ছে ধরে রাখা যাবে না।  

ভিতরে গিয়ে যে দৃশ্য দেখল তাতে অম্বরের মাথায় যেন বজ্রপাত হল।

সে দেখল, দুই সারিতে মোট ষোলোটি টয়লেট, প্রতেকটা টয়লেটের দরজা ভিতর থেকে বন্ধ। তার মানে ভিতরে  ষোলোজন ভাগ্যবান বসে আছেন। এবং প্রত্যেক টয়লেটের সামনে একজন করে লোক দাঁড়িয়ে, এদের মধ্যে পাঁচটা টয়লেটের সামনে আবার দুজন করে দাঁড়িয়ে।  

অনেক আগে এখানে বহুবার  এসেছে, কোনদিন এরকম হউসফুল পায় নি, ষোলোটার মধ্যে একটা ত অন্তত খালি থাকবে ! যেন অমিতাভ বচ্চনের সদ্য মুক্তি পাওয়া কোনো হিট ছবির টিকিট কাউন্টারেরর সামনে দাঁড়িয়ে আছেসেটা তবু ভাল , ব্লাকএ টিকিট কেনা যেত ,এখানে সে উপায়ও নেই।   

ব্লাকের কথায় মাথায় এল , ‘যাবে নাকি একবার , ওই মোড়ায় বসা লোকটাকে একবার বলে দেখতে, একটু টাকা দিয়ে যদি আগেভাগে ঢোকার ব্যবস্থা করা যায়, ‘ শালা , যেন তিরুপতির মন্দিরে এসেছে, ঘুষ দিয়ে মন্দিরে আগে ঢোকার ব্যবস্থা করছে...’ অম্বর মনে মনে বিড়বিড় করল।

ভাবামাত্র অম্বর ফিরে গেল ছেলেটির কাছে।

‘ভাই , আমি একটু বেশি পয়সা  দিচ্ছি, আমাকে একটু আগেভাগে করে দেবার ব্যবস্থা করে দাও না! , আর ধরে রাখতে পারছি না ’ – অম্বর কাঁচুমাঁচু মুখ করে বলল। বলতে বলতে অম্বর একটা পাঁচশ টাকার নোট বার করে দেখাল।

‘হবে না দাদা, সরি, আপনার অবস্থাটা বুঝতে পারছি, কিন্তু সকলেরই ওই এক সিচুয়েশন...’ – ছেলেটি বলল।
একটু থেমে ছেলেটি আবার বলল - ‘আপনি ওখানে যারা লাইনে দাঁড়িয়ে আছে , তাদের মধ্যে কাউকে বলে দেখুন , তারা যদি আপনাকে আগে যেতে দেয়’

অম্বরের ইচ্ছা হল লোকটার গলাটা টিপে ধরে, কিন্তু কিছু করার নেই। চারিদিকে শোনা যায় দেশটা নাকি অসৎ, লোভী, ঘুসখোর লোকে ভরে গেছে... কই যখন দরকার তখন ত পাওয়া যায় না!!

ভগ্ন মনোরথ হয়ে অম্বর আবার আগের জায়গায় ফিরে এল। একটা লোকের পিছনে দাঁড়াল। ভিতরের একটা লোকও  এখনো বেরোয় নি। কেউ কেউ আবার সেল ফোনে কথাও বলছে।

 ‘এবার বেরো না রে বাবা!’ – অম্বর মনে আবার গালি পারতে লাগল।

কোনটা যে আগে বেরোবে, কে জানে! সে যে লাইনে দাঁড়িয়েছে , সেটা কি আগে বেরোবে ? নাকি অন্যটা ? কেউ জানে না, এটাও একটা গ্যাম্বেল , তাদেরই জিৎ হবে , যারা ভাগ্যবান। 
বাইরে দাঁড়ান কয়েকজন লোক ইতিমধ্যে অস্থির হয়ে পড়েছে। তাদের চোখমুখ দেখে মনে হল বুঝি ‘এই হয় কি সেই হয়’।

অম্বরের মনে হল যদি পায়খানার যন্ত্রনা মাপার কোনো যন্ত্র থাকলে বেশ হত ,কে কোন লেভেলএ আছে এবং সেই লেভেল অনুযায়ী তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হত ।

অম্বরের দুই পা আবার কাঁপতে লাগল, অনেকক্ষন ধরে রেখেছে সে , এবার মনে হল সবকিছু নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে যাবে।

সে তার সামনে দাঁড়ানো লোকটাকে বলল – ‘দাদা , আমাকে কি একটু আগে যেতে দেবেন , প্লিজ!, আমি বেশি সময় নেব না, দু মিনিট নেবো ,অবস্থা খুবই সঙ্গিন! ’

‘না দাদা , পারব না, আমার যে কি অবস্থা আমি নিজেই বুঝছি, মুখ দেখে হয়ত বুঝতে পারছেন না , কিন্তু ভিতরে পুরো তোলপাড় চলছে ‘- লোকটি বলল।

‘ও!’ – অম্বর আর কথা বাড়াল না

‘শুধু আমি না , আমার এক বন্ধুও আছে এখানে ‘ – লোকটি আবার বলল।

‘অ্যাঁ ... মানে ?’ – অম্বর বলল।

‘আর বলবেন না , সকালে একসাথেই ট্রেন ধরে হওড়া থেকে কলকাতা আসছিলাম, তো সকাল থেকে যাবতীয় খাওয়া দাওয়া একই রকম হয়েছে বলতে পারেন, তাই বোধ হয় পায়খানাটাও একই সাথে পেল। তো আমরা যখন এলাম, একটা খালি ছিল, তো আমি আমার বন্ধুকে আগে যেতে দিলাম, হেঁ হেঁ..বুঝলেন কিনা’ – লোকটি অন্য একটা টয়লেটের দিকে আঙ্গুল দেখিয়ে বলল।    

 ‘তা আপনি ওটার দরজার সামনেই দাঁড়াতে পারতেন, যদি উনি একটু বুঝে সুঝে একটু তাড়াতাড়ি করতেন হয়ত।‘ – অম্বর বলল।  

‘ওরে বাবা! বলছেন কি মশাই ? জেনেশুনে এই ভুল করব ভেবেছেন ? ‘ – লোকটি বলে।

‘কেন ? ‘ – অম্বর একটু আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করল।

‘আর বলবেন না , একবার ঢুকলে কমপক্ষে আধঘন্টা ধরে রাখুন, পাঁচ বছর ধরে একই মেসের একই রুম এ আছি মশাই...হেঁ হেঁ’ – লোকটি মাথা নাড়তে নাড়তে বলল।

‘বলেন কি দাদা’ – অম্বর চোখ বড়বড় করে বলল।

‘হেঁ, হেঁ, সেজন্যই ত এখানে দাঁড়িয়েছি মশাই , তবে আপনি একদম চিন্তা করবেন না, আমি কিন্তু ঢুকব আর বেরোব’ – লোকটি একটু চোখ নাচিয়ে বলল।

‘সবাই তাই বলে’ – অম্বর মনে মনে বলল।

লোকটির বন্ধু যে টয়লেটাতে আছেন , তার সামনে যিনি দাঁড়িয়ে আছেন , সেই ভদ্রলোকের মুখের দিকে একবার আরচোখে তাকাল অম্বর, বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি হবে, চোখেমুখে প্রচুর প্রত্যাশা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন , কিন্তু উনি তো আর জানেন না , কি মোক্ষম জায়গায় তিনি দাঁড়িয়েছেন। 

হঠাৎ ‘ফওওওওশশশশশশশশ...’ করে একটা আওয়াজ হল। 

ফ্লাশের আওয়াজ।

‘আঃ , কি মিষ্টি আওয়াজ! , এই আওয়াজের মধ্যেই তো লুকিয়ে আছে  এখানে দাঁড়ানো বাইশজন লোকের দুঃখ ,  দুর্দশা ও হতাশার অবসানের মঙ্গলধ্বনি!’ – অম্বর চোখ বন্ধ করে সেই আওয়াজ শুনল।

অম্বরের কর্নকুহরে এই মুহুর্তে ফ্লাশের আওয়াজ সুরসম্রাট মিঞা তানসেনের সুরের থেকেও মধুর শোনাল। পরিস্থিতি মানুষকে কোথায় নিয়ে যায়!

ফ্লাশের আওয়াজ হওয়া মাত্র সবাই একটু সচেতন হয়ে গেল। সবাই দেখতে লাগল কার দরজা খোলে, যেন লটারীর রেজাল্ট বেরিয়েছে, কার ভাগ্যে শিকে ছিঁড়েছে কে জানে।

ছিটকিনি খোলার আওয়াজ হল, অম্বরদের সারির তিন নম্বর দরজাটা খুলল, সেই দরজার সামনে অবশ্য অলরেডি দুইজন দাঁড়িয়ে। চোখেমুখে তৃপ্তির আভাষ নিয়ে একজন বেরোল, ঘেমে নেয়ে একশেষ অবস্থা

তার সামনে যিনি ছিলেন, এই মুহুর্তে তিনিই এখন সবার হিংসার পাত্র। ভিতরের লোকটি বেরিয়ে এলে , ইনি টপ করে ঢুকে ছিটকিনি বন্ধ করে দিলেন

আবার সেই অসীম প্রতীক্ষা ! এক সেকেন্ডও আর কাটতে চাইছে না। অম্বরের তলপেটের নীচে জীবানুরা যেন বিশ্বযুদ্ধ শুরু করে দিয়েছে। অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ছিঁরেখুঁরে ধংস করে দেবে মনে হচ্ছে। অম্বর পেটের কাছে হাত দুট চেপে একটু উবু হয়ে বসে পড়ল। আর পারছে না, শেষরক্ষা বোধহয় আর করা গেল না।

হঠাৎ কানে এল সেই সুমধুর আওয়াজ , হ্যাঁ একটা ফ্লাশ হয়েছে। খুব কাছ থেকে আওয়াজ টা শোনাল। তাহলে এটা কি তারই লাইনে হল ?
যা ভেবেছিল ঠিক তাই, তাদের সামনের টয়লেটের দরজা খুলল, যিনি বেরলেন তাঁর মুখ দেখে মনে হল ঠিক মনের মতো করে হয়নি।
সামনের লোকটা তড়িঘড়ি করে ঢুকতে গেল, দরজাটা  ঠেলে ভিতরে পা রাখতেই হঠাৎ থমকে দাঁড়াল

‘কি ব্যাপার দাদা , যান তাড়াতাড়ি , এরপর তো আমি’ – অম্বর বসে বসেই বলল

‘না মানে...ঠিক বুঝতে পারছি না’ – বলে লোকটি ইতস্তত করতে লাগল।

অম্বর ঝট করে উঠে পড়ল, ব্যাপারটা কি! লোকটির পাশ দিয়ে উঁকি মেরে টয়লেটের মধ্যে যা দেখল, তাতে তার মনে হল,   ‘ভগবান যা করেন , মঙ্গলের জন্যই করেন’।    

দেখে যা বুঝল , আগেরজন ঠিকঠাক শুট্‌ করতে পারেন নি, তাই বর্জ্যটি নির্দিষ্ট গর্তে না পড়ে দিকভ্রষ্ট হয়েছে ,যার ফলস্বরুপ  পায়খানার প্যানটার পিছনের দিকে বেশ খানিকটা জায়গা জুড়ে একটা গাঢ় হলুদ রঙের সেমি-লিকুইড পদার্থ কায়েম করে বসেছে। কয়েকটা জায়গা অল্প উঁচু হয়ে আছে। ফুলকপি,আলু দিয়ে  খিচুড়ী করে বড় থালাতে ঢাললে যেমন দেখতে লাগে , অনেকটা সেরকম।

লোকটির ইতস্ততা দেখে অম্বর আর মহামুল্যবান সময় আর নষ্ট করল না।

‘আমার কোনো অসুবিধা হবে না , দাদা’ - বলে সে লোকটাকে পাশ কাটিয়ে টয়লেটের ভিতরে ঢুকে গেল  ‘বেরনোর আগে সব পরিস্কার করে দেব, কোনো চিন্তা করবেন না , এই গেলাম আর এলাম’ – বলে অম্বর ভিতর থেকে ছিটকিনি বন্ধ করে দিল।

‘এই , এই , তাড়াতাড়ি বেরোবেন কিন্তু...কি মুস্কিল !’ – লোকটা হাঁ হাঁ করে উঠল।

এক ঝট্‌কায় যতটা বেরোবার বেরিয়ে গেল, বেশিরভাগটাই মনে হল বায়ু, তার সাথে খলমল করে কিছু খুচরো খাচরা বেরল, তারপর আবার সেই ‘ন যযৌ, ন তস্থৌ’। এবার ঠেলে ঠেলে পাঠাতে হবে। কিন্তু বেশি কিছু করা গেল না, এদিকে বাইরের লোকটা দরজাতে নক্‌ করতে শুরু করেছে।

অম্বরের এখনো যা অবস্থা মনে হচ্ছে অনন্তকাল ধরে এখানে বসে থাকলেই বেশ হত।  

পরিস্কার হয়ে এবং করে যখন বেরল, দেখল লোকটা বেশ ছটফট করছে, তাড়াতাড়ি বেরিয়ে গেল অম্বর

অম্বর বুঝতে পারল, তার পেটের অবস্থা মোটেই ভাল না, যত তাড়াতাড়ি পারা যায় ওষুধটা কিনে নিতে হবে।

বাইরে বেরিয়ে অম্বর দেখল, তুলতুলি ইতিমধ্যে এসে বাইরেটায় দাঁড়িয়ে আছে।  

‘কি গো, হল শান্তি ? বাব্বা... সেই কখন গেছ , ওখানে অপেক্ষা করতে পারলাম না, তাই এখানে চলে এলাম‘  - তুলতুলি বলল।

‘হু, হয়েছে , কিন্তু মনে হচ্ছে যেন আবার এখুনি যাই...’ – অম্বর বিমর্ষ মুখে বলল।

‘এ বাবা , সে কি গো, ইসস , ওষুধটা আসার সময় খেয়ে নিলে ভাল হত‘ – তুলতুলি বলে।

‘হ্যাঁ , এখন চল, একটা ট্যাক্সি ধরে রওনা দিই, যাবার পথে বাজারের দোকান থেকে তুলে নেব।‘- অম্বর বলে।

স্ট্যান্ড থেকে একটা ট্যাক্সি ধরে ওরা অম্বরদের বাড়ীর দিকে রওনা হল। আরও চল্লিশ মিনিট লাগবে ওদের পৌঁছতে। যাবার পথে ওষুধ কিনে খেয়েছে। দেখা যাক কি হয়।

ট্যাক্সিটা শহর ও শহরতলী ছেড়ে ফাঁকা জায়গার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। চারিদিকে শুধু ধানখেত , বেলা পরে এসেছে,  অম্বর জানলার কাচটা একটু নামিয়ে দিল, হাল্কা মিষ্টি একটা হাওয়া দিচ্ছে, অম্বর জানলা দিয়ে বাইরের চলমান দৃশ্য দেখতে লাগল।  

তুলতুলি ফোনে কথা বলছে , ফোনের কথপোকথন শুনে অম্বর বুঝল, অনেক কিছু নাকি রান্না হচ্ছিল, সেসব নাকি নাকি এখন বন্ধ , পেট খারাপের খবর শুনে।  অম্বর ঠিক খুশি হল না শুনে।

কথাবার্তায় শুনল, অম্বরের ছোড়দি এসেছে। ছোড়দির সাথে অনেকদিন বাদে দেখা হবে ভেবে অম্বর মনে মনে খুশি হল। ছোড়দিও নাকি অনেক কিছু রান্নাবন্না করার প্লান করেছিল,এসব শুনে সে নাকি আজ সব বন্ধ রেখেছে, ঠিক থাকলে কাল করবে বলেছে।   

‘নাঃ যেভাবেই হোক কালকের মধ্যে ভাল হতেই হবে’ – অম্বর মনে মনে বলে।  হঠাৎ পেটটা বেশ একটু মোচড় দিল, তারপর একটা ‘খলখল’ করে শব্দ , যেন পেটের মধ্যে একটা ‘ঝর ঝর ঝর্না’। তুলতুলিও শুনেছে, মুখ ঘুরিয়ে ওকে দেখল, অম্বর ভাবল এটা আবার না ফোনে বলে দেয় , তাহলে আর রান্নাবান্নাই চড়বে না শুধু ট্যাবলেট ,জল, গাঁদাল পাতার ঝোল আর মুড়ি খেয়ে থাকতে হবে।   

গিয়েই একবার বাথরুমে ঢুকতে হবে, পেট ব্যাথাটা আবার বাড়ছে। আর ভাল লাগছে না, কিভাবে যে নিস্তার পাওয়া যাবে কে যানে, অম্বর ভিতরে ভিতরে অস্থির হয়ে পড়ে, মঝে মাঝে মনে হচ্ছে , ডাক্তারের কাছে গিয়ে বলে যে তলপেটের ভিতরে নীচের দিকটা যদি কেটে বাদ দেওয়া যায় , এরকম  বেয়ারা জীবানু অম্বর জম্মে দেখে নি।

বাড়ী পৌঁছে অম্বর সোজা বাথরুমে ঢুকল। প্রথম ঝটকায় ‘ফলাৎ’ করে তরল পদার্থটা বেরিয়ে গেল। শুরু হল আবার ঠেলাপর্ব। একটাই শান্তি যে , বাইরে থেকে কেউ নক্‌ করবে না বেরিয়ে আসতে বলার
ভিতরে বসে অম্বর শুনতে পেল, তার পেটের অবস্থার কিভাবে ভাল করা যায় সে নিয়ে বেশ জোর কদমে আলোচনা শুরু হয়ে গেছে। কেউ বলছে সারাদিন মুড়ি ভেজানো জল খেয়ে থাকতে, কেউ বলছে একটু ভাতের সাথে গাঁদালের ঝোল  খেতে, কে একজন আবার বলল কষা মাংস দিয়ে গরম গরম ভাত খেলে নাকি পায়খানা এঁটে যায়। 

কে বলল এটা ? তুলতুলির মত গলাটা শোনালো , যেই বলুক , অম্বরের বেশ মনে ধরল দাওয়াটি।  

অম্বর বেরিয়ে এল। অনেকটা স্বস্তি লাগছে, সলিড কিছু বেরিয়েছে। ওষুধটা ভাল।

ছোড়দি বলল ‘ তাহলে একটু লুচি ভাজি ? কয়খানা ফুলকো লুচি আর কষা মাংস খা আজ’

‘হ্যাঁ, হ্যাঁ সেই ভাল...’ বলে অম্বর ভিতরে চলে গেল। একটু বিশ্রামের প্রয়োজন। অম্বর একটু ভাল বোধ করতে লাগল। রাত্রে যখন খেতে বসল, বেশ ভাল খিদে পেয়েছে, তৃপ্তি করে খেয়ে অম্বর ঘুমোতে গেল।

...মাঝ রাতের দিকে  অম্বরের পেট ব্যাথায় আবার ঘুম ভেঙ্গে গেল, ঠিক বুঝতে পারল না কোথায় সে, এক্ষুনি  বাথরুমে যাওয়া দরকার, বেরিয়ে এসে খুব আশ্চর্য হয়ে গেল, একি ? এ কোথায় সে , এটা ত বর্ধমানের সেই নবাবের হাটের ১০৮ শিব মন্দির এর জায়গাটা, বাথরুম এ যেতে গিয়ে এখানে কি করে এল, সামনে সারি  সারি মন্দির , অম্বর আরও আশ্চর্য হল, যখন দেখল , মন্দির গুলির ভিতরে কোনো শিবলিঙ্গ নেই , তার পরিবর্তে রয়েছে একটা পায়খানার প্যান, একটা জলের কল আর একটা প্লাস্টিকের মগ। অম্বর মনে মনে ভীষন খুশি হল, ১০৮ টা টয়লেট! এবং দু একটা ছাড়া সবই প্রায় ফাঁকা! অম্বর দৌড়ে একটা মন্দিরে ঢুকল , মনে মনে ভাবল  ‘ইসস! এত ফাঁকা টয়লেট আর সে কিনা শুধু একটা তে করেই ক্ষ্যান্ত থাকবে ? সে কি করে হয়?’  তাই কিছুটা করে সে ব্রেক মেরে দিল, তারপর বেরিয়ে এসে আবার একটাতে ঢুকল, ...তারপর আবার একটাতে...তারপর আবার একটা...  ...বাতাসে একটা গানের সুর ভেসে আসছে ‘আহা কি আনন্দ , আকশে বাতাসে...’ , আজ অম্বরের সত্য সত্যই খুব আনন্দ হচ্ছে, এইভাবে একটার পর একটা টয়লেটে সে হানা দিতে লাগল,... প্রায় দশটা টয়লেটে ঢোকার পর, সে পেট ফাঁকা করল ...আনন্দে আত্মহারা হয়ে  চিৎকার করে উঠল অম্বর...

অমনি অম্বরের ঘুমটা গেল ভেঙ্গে। চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষন বসে রইল, মনে মনে হাসল স্বপ্নটার কথা ভেবে। তিন  বছর আগে যখন এদেশে এসেছিল ,তখন বর্ধমানের  নবাবহাটে ১০৮ মন্দিরে গিয়েছিল, আর সম্প্রতি ভারতের   প্রধানমন্ত্রী যখন বলেছিল ‘Build toilet first , temple later’, অম্বরের কথাটা বেশ মনে ধরেছিল। স্বপ্নটা এ দুটোরই খিচুরী।  

অম্বর চোখ খুলল , ভোর হয়ে এসেছে।জানলার ফাঁক দিয়ে হাল্কা আলো ঘরের মধ্যে এসে পড়েছেতুলতুলি এখনো ঘুমিয়ে রয়েছে। জানলার পাশেই একটা পেয়ারা গাছ, কয়েকটা চড়াই পাখি সেখানে কিচিরমিচর করছে, ওরা বোধহয় খুব সকাল সকাল ওঠে। জানলার পাশ দিয়েই চলে গেছে লাল মাটির রাস্তা সোজা স্টেশনের দিকে। লোকজনের যাতায়াতের শব্দ ভেসে আসছে। প্যাঁক,প্যাঁক শব্দ করতে করতে একটা রিক্সা চলে গেলহঠাৎ একটা  রাস্তার কুকুর কেঁঊ কেঁঊ করে উঠল, নির্ঘাত রিক্সার চাকা কুকুরটার লেজে বা পায়ের ওপর দিয়ে গেছে। বাইরের কোথাও   থেকে উনুনের ধোঁয়ার ও তার সাথে তেলেভাজার গন্ধ নাকে এল। অম্বর ভাবল, এইসব কিছুর আস্বাদন পেতেই এই দেশে বার বার আসা যায়। এই জিনিসগুল ওখানে ভীষনভাবে মিস করে। যদিও এটা অনেকটা ‘নদীর ওপার কহে ছাড়িয়া নিশ্বাস...’ এর মত।

শরীরটা বেশ আজ ঝরঝরে লাগছে , পেটে আর কোনো ব্যাথা নেই,  ওষুধ, লুচি আর কষা মাংস ভালই কাজ করেছে মনে হচ্ছে। রান্নাঘরে খুটখাট আওয়াজ পেল অম্বর, কড়াইতে গরম তেলে কিছু একটা পড়ল বোধ হয়, আজ আবার ছোড়দি আনেক কিছু রাঁধবে বলেছে, তারই বোধহয় তৈয়ারি চলছে। বরবরের পেটুক অম্বরের ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটে উঠল। চোখটা ধীরে ধীরে আবার বুজে এল।

অম্বর আবার ঘুমিয়ে পড়ল। 

Monday, February 2, 2015

একটি প্যানপ্যানানি কবিতা

একটি প্যানপ্যানানি কবিতা
অমলেন্দু ঠাকুর 

কখনো তুমি ছলাৎ ছলাৎ জল,
কখনো তুমি বুদবুদ, কখনো বা জমে দই।
তোমার গোমড়া মুখে হাসি ফোটা , এবং
বাব্‌ল ফাটা র মধ্যে অদ্ভুত মিল, দুটোই বড়
নিঃশব্দে হয়।
বাতাস বয় শন শন শব্দে...শন শন করে যায় গুন্তি
হইতে নির্গত তীর। পার্থক্য শুধু এই বাতাস হৃদয় ছোঁয় না,
তীর হৃদয় ছোঁয় , শুধু স্পর্শ করে না, বিদীর্ণ করে  দিয়ে যায়।
লিখে দিয়ে যায় রক্তাক্ত অক্ষরে ‘আমি তোমাকে ভালবাসি’।
তুমি গোঁসা করলে , ঘরপোরা গরু সিঁদুরে মেঘ দেখে,
হিরোসীমা নাগাসাকি বলে, আমাদের পাতালে পাঠিয়ে দাও।
তোমার অতীব ক্রোধ হয়ত এই বিশ্বব্রম্মান্ড কে কৃষ্ণগহ্বর এর চোরাস্রতে
টেনে নিয়ে যেতে পারে, তাই তো আমি বাব্‌ল ফাটা দেখতে ভালবাসি।
মুক্তি , ওরে মুক্তি কোথায় পাবি, মুক্তি কোথায় আছে... 
মুক্তি ত আমি চাই না, আমি চাই মুক্তো,
তোমার হাসিতে যে মুক্তো ঝরে,সে মুক্তো না,
আমি চাই সেই মুক্তো যা পাওয়া যায় ঝিনুকের উদর নিংড়ে,
যার বিনিময়ে পাওয়া যায় শত সহস্র ডলার এর মোড়ক,
আর সেই মোড়কের কেন্দ্রবিন্দুতে চুপটি করে বসে থাকব আমি,


নিশ্চিন্তে নিভৃতে !

খোকা ৪২০ মুভি রিভিউ।

খোকা ৪২০ (দেব, শুভশ্রী,নুসরত,তাপস,রজতাভ) : কিছু চিন্তা , কিছু ভাবনা

অমলেন্দু ঠাকুর 


উপরোক্ত বাংলা ছবিটি আজ দেখলাম , তাই কিছু লিখতে ইচ্ছা করল। 

গুটি গুটি পায়ে বাংলা ছবি যে আজ অনেক পথ পেরিয়ে প্রাপ্তবয়স্ক তে পরিনত হয়েছে , তা খোকা-৪২০ ছবি না দেখলে বোঝা যাবে না। ছবিটিতে নাকি তেলুগু ছবির ছায়া আছে বলছে, কিন্তু শুধু ছায়া নিয়ে তো আর ছবি হয় না, সেই ছায়া তে রক্ত মাংস লাগিয়ে ছবিটিতে পরিপূর্নতা আনার পুরো কৃতিত্ব অবশ্যই বাঙ্গালী পরিচালক ও প্রজোযকদের। ছবিটির একদম শুরুর দিকেই “Mad I am , তোর প্রেমে , Mad I am mad…” গানটি সত্যই মন কে একটু এবং বেশি করে কানকেই নাড়া দিয়ে যায়। এছাড়া “সলিড কেস খেয়েছি...” , “গভীর জলের ফিস আমি ...” গানগুলি যেমন নয়নাভিরাম তেমনি শ্রুতিমধুরও বটে। বাহবা দিতে হয় গানগুলির গীতিকারকে , আমার মনে হয় উনি একজন ভাল ডাক্তার এবং গানও লেখেন, কারণ দর্শকদের নারীটা এত ভাল বোঝেন ! 

ছবিটিতে সবথেকে যেটা বেশি টানে , সেটি হল এর Action Stunts, যার জন্যই এটাকে প্রাপ্তবয়স্ক বলা যায়। শুধু বলিউড কেন, হলিউড এও এরকম Action আগে দেখেছি বলে মনে পড়ে না। নায়কের চরিত্রে দেব অবলীলাক্রমে সেইসব দুর্দান্ত ও রোমহর্ষক Action সিন করেছেন। অভিনয়েও উনি কম যান না, তবে অভিনয়ের থকে মারপিট করতেই ওনার সময় বেশি চলে গেছে।
উড়তে অনিচ্ছুক একপাল হাঁস কে পিছন থেকে তাড়া করলে তারা যেভাবে উড়ে যায়, সেভাবেই দেব ও শ্ত্রুপক্ষের ৪/৫ টা গাড়ী একসাথে উড়ে এ ওর ওপর গিয়ে যেভাবে পড়ছে, তা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। সত্যি অপূর্ব। এটাতো কিছুই না, আরও নানারকম উদ্ভাবনী Stunts দেখতে পাবেন এই ছবিতে।

পার্শ্বনায়িকা হিসাবে নুসরত দারুন অভিনয় করেছেন। সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা বাংলার ‘রূপ, রস,গন্ধ,স্পর্শ’ সবই ইনি পেয়েছেন, এনাকে আর পায় কে ? দেখতে মিষ্টি ও অভিনয়ও মিষ্টি, মাঝে মাঝে একটু যেন আড়ষ্ট, বোধহয় লজ্জায় । কিন্তু তাতে কি ? লজ্জাই ত নারীর ভূষণ।

নায়িকার চরিত্রে শুভশ্রী কাঁপিয়ে দিয়েছেন। এমন ‘সুন্দর,শান্ত,সাবলীল অথচ দরকার পড়লে গর্জে উঠতে দ্বিধা না করা’ অভিনয় অনেকদিন দেখি নি। তবে এই চরিত্রটাতে বলিউড এর আদুরে নায়িকা হিসাবে খ্যাত ম্যাডাম জুহি চাওলা কে খুব মিস করেছি।যতদুর চোখ যায় এক সবুজ প্রান্তর, তার একদিকে বলিষ্ঠ বুকের পাটা সহ ৬-প্যাক নিয়ে নায়ক হাফ উদোম হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন , অন্যপ্রান্ত থেকে নায়িকা দুহাতে নিজের ঘাঘরাটি খামছে ধরে অল্প একটু তুলে (যাতে হোঁচট না খেতে হয় ) slow motion এ দৌড়তে দৌড়তে এসে নায়কের বুকে আছরে পড়ছেন এবং তারপর নায়ক ও নায়িকা দুজনেই চুড়মার হয়ে যাচ্ছেন , এইরকম দৃশ্যে ম্যাডাম জুহি র জুরী মেলা ভার। শুভস্রী র পক্ষে অতটা সম্ভব হয় নি , তবে চেষ্টার ত্রুটি রাখেন নি।

বেশকিছু আবেগজড়িত ডায়লগ এ ভর্তি এই ছবিটি। তাই স্পর্শকাতর দর্শক দের চখ কড়কড় করে উঠতেই পারে , তাই আগেভাগে টিস্যু পেপার কাছে রাখা বাঞ্ছনিয়। কারণ টিস্যু পেপার আনতে যে মহামূল্য সময় নষ্ট হবে , তা একেবারেই বুদ্ধিমানের কাজ না।
মারপিট , গান ও আবেগজড়িত ডায়লগ , এইসব বাদ দিলে , ছবিটার বাকীটা শিক্ষামূলক বলা যায়। মানুষের জীবনের ঘাত প্রতিঘাত, কলহ, দ্বিধা দ্বন্দ্ব, ভুলভ্রান্তি এবং সবশেষে সত্যের ই জয়গান গাওয়া হয়েছে ছবিটিতে।

কঠিন,বিশ্রী ,শুস্ক ও তীব্র ঠান্ডার পর যেমন কোকিল এর কুহু ডাক , পাখির কলকাকলী ও গাছের ডালের ফাঁকে সবুজ পাতার উঁকি মারা দিয়ে যেমন ঝকঝকে বষন্ত আসে, ঠিক সেইভাবেই এই ছবিটিতেও ঠেলাঠেলি , ধাক্কাধাক্কি , মারপিট , রক্তারক্তি ও বহু কথা কাটাকাটির পর শেষ দৃশ্যে সবাই হাসিমুখে একসাথে দাঁড়িয়েছেন। যারা সত্য কে মানতে চান নি, তাঁরা বলেছেন ‘না আমরাই ভুল ছিলাম ‘ আর যারা সত্যের জন্য লড়াই করছিলেন তাদেরও মুখে জয়ের হাসি...কেমন যেন একটা গদগদ সিন। অপূর্ব এই দৃশ্য...চোখে জল এসে যায়। (টিস্যু পেপার!! )

যেহেতু দুটি নায়িকা, আন্তজার্তিক চলচিত্রের নিয়ম(?) মেনে এ ছবিতেও একজন নায়িকা ( এখানে নুসরত) নিজে আত্মত্যাগ করেছেন , তবে হ্যাঁ, সেই সেকেলে ছবির মত তিনি সুইসাইড বা খলনায়কের গুলি তে মারা যান নি। সত্য কে মেনে নিয়েছেন নিঃশর্ত ভাবে। এটাই এই ছবির u.s.p. বলা যায়। কে জানে হয়ত বা পার্ট-২ তে , পরিচালক এই নায়িকা কে মেরে ( বা ডিভোর্স করিয়ে, বিয়ে ত আবার বেশিদিন আজকাল টেকে না) নূসরত কে তার বেঘোরে খোয়ানো প্রেমিক কে পাইয়ে দেবেন , নায়ক ও খুশি, কারণ ততদিনে তিনিও হয়ত নায়িকার সাথে হাঁফিয়ে উঠেছেন।

এই ছবিতে আর একটি বড় পাওয়া হল তাপস পাল ও রজতাভ দত্ত এর অভিনয়। সম্পুর্ন ভিন্ন রুপে এদের দেখতে পাবেন। মাঝে মাঝে এটা মনে হওয়া একদমই অস্বাভাবিক নয় যে “এনারা ওঁরাই তো ??”

নির্মম ও নিষ্ঠুর খলনায়ক এর চোখে কাজল পরার বলিউডি পরম্পরা , এই ছবিতেও বর্তমান। তবে একটু বাঙালীয়ানা আনতে মেকাপম্যান কাজল টা শুধু চোখের পরিসীমার মধ্যেই আবদ্ধ রাখেন নি , কানের দিকে কিছুটা টেনেও দিয়েছেন, ছোটোবেলায় আমাদের মায়েরা যেমন দিতেন। তাই খলনায়ক যখন মার খায় , কেমন যেন একটু মায়া হয়।

ছবিটি youtube নামক ফ্রী মুভি থিয়েটার এ দেখান হচ্ছে। তাই দেরী না করে তাড়াতাড়ী দেখে নিন। কিছু কুচক্রী ও আইনের পৃষ্ঠপোষকের কানভাঙ্গানি তে , হল মালিক আবার ছবিটি তুলে না নেয়।

সর্বশেষে একটা কথা বলতে চাই, ছবিটির একশত ভাগ অনুধাবন করতে চাইলে, আপনি একদিন ছুটি নিন , (কিন্তু স্ত্রী যেন ছুটি না নেয়), স্ত্রী কে অফিস এ পাঠান, বাচ্চাদের স্কুল বা ডে কেয়ার এ পাঠিয়ে নিশ্চিন্ত মনে দেখুন। কোনোরকম disturbance এই ছবিটি দেখার সময় খুবই মারাত্মক, কারণ ছবিটি দেখতে দেখতে আপনি যখন বিভোর হয়ে যাবেন , আপনার শরীরের শিরা ,উপশিরায় একপ্রকার রসের সঞ্চারন হবে, তাই কোনোরকম disturbance আপনার এই রসের প্রবাহ বন্ধ করে দিতে পারে, যেটাতে আপনি হয়ত মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলতে পারেন।

তাই দয়া করিয়া দেখার আগে ভেবেচিন্তে, প্লান করে দেখুন।
যাইহোক আমার কথাটি ফুরলো, নটে গাছটি মুড়লো!

মায়াজাল

                       মায়াজাল            

                                      অমলেন্দু ঠাকুর 




কাপড়া কফিন

কাপড়া কফিন

নামটা শুনে বেশ কৌতুহল হয়েছিল , অদ্ভুত নামটা ‘কাপড়া কাফিলা’ । কলিকাতার গড়িয়াহাট অঞ্চলের কাছাকাছি কোন এক বসতবাড়ীর মধ্যই মনে হল এই দোকানটি। প্রধানত মেয়েদের বুটীক শাড়ী পাওয়া যায়। এছাড়াও ছেলেদের পাঞ্জাবি ও অন্যান্য জিনিসও পাওয়া যায়।
‘কাপড়া কাফিলা’ না বলে ‘কাপড়া কফিন’ বললে বোধহয় ভাল হত। এরকম শ্বাসরোধকারি দোকান আমি আর দুটি দেখিনিদোকানের ভিতর প্রবেশমাত্র দোকানদার (বা গৃহস্বামী বলাই বোধহয় ভাল) , ‘হাই’ বলিয়া সম্বোধন করিলন। যে ভদ্রমহিলা এই দোকানটির হত্তাকত্তা , ইনি মনে হয় ওনারই স্বামী। পরনে একটি ধবধবে সাদা পাজামা ও সাদা পাঞ্জাবী। একদম ধোপধুরস্ত।
পথে কোনোরকম অসুবিধা বা দোকান চিনতে কোনো অসুবিধা হয়েছে কিনা ইত্যাদি জানার পর ,একটু যেন করজোরেই ক্ষমা চেয়ে নিলেন, যে ওপরে যেখানে লোভনীয় শাড়ীগুলি রাখা আছে সেই ঘরের শীততাপ নিয়ন্ত্রনকারী যন্ত্রটি নাকি কাজ করছে না, তাই আমাদের নাকি খুব কষ্ট হবে। কেমন যেন মনে হল আমরা এখানে মধ্যাহ্ণভোজনের নিমন্ত্রন খেতে এসেছি,একটু পরেই হয়ত ডিশ ভর্তি খাবার হাজির হবেভেবে একটু খুশিই হলাম , কারন আমি একটু পেটুক লোক, খাবার এর নাম শুনলেই দেহের শিরা-উপশিরায় যেন দোল খেলা শুরু হয়ে যায় আর রক্তকনিকা গুলি ‘হোলি হ্যায়, হোলি হ্যায়’ বলে লাফাতে থাকে। যদিও খাবারের কোন আয়োজন বা তার আভাষ দেখতে পেলাম না।  
পরমুহুর্তেই হাজির হলেন দোকানের মালকিন, যিনি ‘Hi !!...Sorry for being late…’  বলে সেই যে ইংরেজীতে শুরু করলেন , একদম শেষ অবধি টেনে গেলেন। সবাই বাঙ্গালী হওয়া সত্বেও , কোন এক অজ্ঞাত কারণে উনি সারাক্ষন বিজাতীয় ভাষায় কথা বলে গেলেন। যেটুকু বাংলা মুখ ফস্কে ও ভুলবশত বেরিয়ে যাচ্ছিল , তা তিনি ‘I mean ..’  বলে শুধরে ইংরিজী করে নিচ্ছিলেন।
যাইহোক শাড়ী দেখতে ওপরে দোতলায় উঠলাম। ভদ্রমহিলা আবার একপ্রস্থ ক্ষমা চেয়ে নিলেন, আমাদের ঠান্ডা হাওয়া দিতে না পারার জন্য। অনেকরকম  রঙ-বেরঙের  শাড়ীতে ভর্তি ওপরটা। বর্নান্ধদের কাছে যেমন সব রঙ ই সমান , আমার কাছেও সব শাড়ীই একই লাগে। কোনটা যে ভাল আর কোনটা যে খারাপ বুঝতে পারি না। কতরকম তাদের নাম কতরকম তাদের ডিজাইন।
সেদিন নিউমার্কেটের কাছে একটা বই-এর দোকানে বই ঘাঁটতে ঘাঁটতে ‘Indian Sarees’ এর ওপর একটা ইয়া মোটা বই দেখলাম কয়েকটা পাতা উলটে দেখলুম ,বিভিন্ন সব শাড়ীর গুনগান করা হয়েছে বইটির মধ্যে তাদের কতরকম ছবি , কিভাবে পরতে হয় , কোনটা কত লম্বা ও কত চওড়া ,কোন প্রদেশের মহিলারা কি ধরনের শারী পরেন, সেসব বিশদভাবে লেখা মনে মনে ভাবলাম , বাব্বা ওই ১২ হাত লম্বা আর ৪ হাত চওড়া ন্যাকরা’ কে নিয়ে এত আদিখ্যেতা কিসের , বুঝি না লেখক/লেখিকার নাম দেখতে গেলাম, দেখলাম একটি নয় অনেকজন মিলে লিখেছেন এবং আশ্চর্যজনক ভাবে সবাই লেখক, একটিও লেখিকার নাম মনে হল না তার মধ্যে একটু যেন লজ্জাই হল  
কিছু শাড়ী আগে থেকেই তুলি পছন্দ করে রেখেছিল, সেগুলি নেওয়া হল এবং (বোধহয়) আরও কিছু নেওয়া হল। সবকিছু নিয়ে আবার নীচে এলাম। মুখের মৃদু হাসিটি অক্ষত রাখিয়া , ধোপধুরস্ত গৃহস্বামীটি  আবার আমদের আপ্যায়ন করে বসালেন এবং তাঁহার দৃঢবিশ্বাস যে ওপরে আমদের গরমে খুব কষ্ট হয়েছে সেটি আবার শোনালেন , ক্ষমাও চেয়ে নিলেন। 
আথিতেয়তার কোনরকম ত্রুটি নেই। মালকিন বিল তৈরী তে ব্যাস্ত হলেন। তুলি একটু বলল যদি দাম কিছু কম করা যায় বা কোনরকম discount দেওয়া হচ্ছে কিনা।
মুখে স্মিতহাসি টেনে গৃহস্বামী বলিলেন এখানে ওসব হয় না। সবকিছুতে একদম ন্যায্য দাম ধার্য করা হয়েছে। ততক্ষনে মালকিনের মুখেও স্মিতহাসি এবং সেই বিজাতীয় ভাষায় একটু গর্বের সহিত উবাচ... ‘To be honest , no-discount is our strong point’…তারপর একটু থেমে এবং মুখমন্ডলে একটু দুঃখী ভাব এনে ও হাল্কা ন্যাকামীর ছোঁয়া দিয়ে...’at the same time , it is our weak point too!’
যা বাব্বা , একই সঙ্গে একই জিনিস strong point আবার weak point , মাথার ওপর দিয়ে গেল। নিজেই নিজেকে ধমকালাম ‘ব্যাটা তুই কি সবজান্তা, যে সবকিছু জেনে বসে আছিস?’
যাইহোক মুখে একটা কুলুপ এঁটে রইলাম।
হঠাত করে পরিবেশ টা কেমন যেন চুপচাপ হয়ে গেল। একদম নিস্তব্ধ। সেটা যে, discount দেওয়া হয় নি তার মনঃক্ষুন্নতার জন্য, নাকি ন্যায্য দাম ধার্য করা হয়েছে তার খুশিতে, সেটা বোঝা গেল না। কেমন যেন দম বন্ধ হবার পরিবেশ। যে কথাগুলি খুব মিস করছিলাম সেগুলি মাথা মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছিল, মুখে আসছিল কিন্তু বলতে পারছিলাম না ’দাদা, ৫০০ টাকা কম করুন...ঠিক আছে দাদা , আপনার কথাও রইল আমার কথাও রইল ৪৫০ এ রফা করুন...খুব পারবেন দাদা...হবে না বলে কিছু হয় না দাদা...এই টাকা রইল , দিতে হয় দিন ,নাহলে চল্লুম ভাই’ ইত্যাদি ইত্যাদি  
এই নিস্তব্ধতার মধ্যে হঠাত করে খসখস করে আওয়াজ শুনতে পেলাম। ঘাড় ঘুড়িয়ে দেখি তুলি টাকা গুনছে, দেবার জন্য। বাঁ হাতের বুড়ো আঙ্গুল থেকে নোট গুলো ফস্কাচ্ছে , আর ডান হাতের বুড়ো আঙ্গুল সেগুলি লুফে নিচ্ছে। এখানেও দেয়া নেওয়ার খেলা।
টাকা মিটিয়ে receipt নিলাম। গৃহস্বামী দাদাটি প্যাকেটগুলি নিয়ে আমাদের গাড়ি অবধি পৌঁছতে আসছিলেন, ধন্যবাদ জানিয়ে বললাম ,তার দরকার নেই। মনে মনে বললাম ‘বেরতে পারলে বাঁচি’। এমনিতেই আমি শপিং-বিমুখ তার ওপর আবার এরকম একটা পরিবেশে কেমন একটু ছটফটানি লাগছিল।
দরজা ঠেলে বেরিয়ে এলাম। তাড়াতাড়ি অথচ সাবধানে গাড়ির দিকে হাঁটা দিলাম, যাতে না আবার হোঁছট খাই। হয়ত হোঁছট খাবার পরই কানে শুনব ‘কোথাও লাগে নি তো!’, আর ঘাড় ঘুরিয়ে দেখব গৃহস্বামী দাদা টি দাঁড়িয়ে , হাতে ফার্ষ্ট-এড বাক্স। কে জানে হয়ত কাচের দরজার ওপার থেকে উনি লক্ষ রাখছেন আমাদের গাড়ি অবধি পদযাত্রা।
গাড়ি তে উঠেই ড্রাইভার কে বললাম তাড়াতাড়ি বেরোতে। মনে মনে ভাবলাম ‘বেরোতে গিয়ে চাকা টাকা আবার ফেঁসে না যায়।‘  যদি ফাঁসেও, গৃহস্বামী দাদাটি যে স্টেপনি হুইল, স্প্যানার ইত্যাদি নিয়ে হাজির হবে না, সে বিষয়ে আমি নিশ্চিত। আবার ভাবলাম ,কিছুই বলা যায় না , হাজির হলেও আশ্চর্য হবার কিছু নাই।
গাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে বাঁক নিতেই ,আড়চোখে (কাপড়া) কফিনের কাচের দরজার দিকে একবার তাকালাম, মনে হল দুই জোড়া চোখ অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। ‘The Others’ ছবির শেষ দৃশ্যটা মনে পরে গেল ,যেখানে মানুষগুলো বাড়ী হতে বিদায় নিয়ে যখন চলে যাচ্ছে, তখন সেই বাড়ীতে বসবাসকারী ভুতের ফ্যামিলি (মা ও শিশুরা ) কাচের জানলার ওপাশে দাঁড়িয়ে ছিল। আতঙ্কে চোখ বুজলাম
কিছুক্ষন চোখ বন্ধ করার পর হঠাত কানে শুনলাম ‘যা নেবেন একশ টাকা, পাঁচটা নিলে একটা ফ্রী! যা নেবেন একশ টাকা, পাঁচটা নিলে একটা ফ্রী!... মাল খারাপ হলে ফেরত হয়..’ ইত্যাদি। স্বস্তির নিঃশ্বাস নিয়ে চোখ খুললাম।
এতক্ষন চারপাশটা ভাল করে দেখি নি, সেই দুপুরে কফিন এ ঢুকেছিলাম, দুপুর গড়িয়ে বিকেল , তারপর সেই বিকেল গড়িয়ে হাল্কা সন্ধ্যা নেমেছে। এতক্ষন ছিলাম কফিনের মধ্যে!
গাড়িটা গড়িয়াহাট বাজারের পাশে একটা গলি দিয়ে বেরচ্ছিল। টুপ-টাপ করে করে বাজারের লাইট গুলি ধীরে ধীরে জ্বলে উঠছে। পশ্চিমের আকাশে একটু লালচে। সারাদিনের প্রখর উত্তাপে কলিকাতা অর্ধ-সিদ্ধ। যদিও তাকে উপেক্ষা করেই বাজারে ও রাস্তায় লোক সমাগমের কোন খামতি নেই। ‘সিটি অফ জয়’ নামটি সত্যিই সার্থক। 
আমাদের গাড়ি গলি ছাড়িয়ে বড় রাস্তায় পড়ল।

Disclaimer : ‘কাপড়া কাফিলা’ দোকানটি নিয়ে যা লেখা হয়েছে , তা নিছকি মজা করেই। কোনরকম ব্যাক্তিগত বিদ্বেষ বা তাকে খারাপ প্রতিপন্ন করা এই লেখাটির উদ্দেশ্য নয়। দোকানটি খুব-ই ভাল এবং সেখানে লোকেদের ব্যবহার সত্যিই প্রশংসনীয়। পাঠকদের এখানে যাইতে আন্তরিকভাবে উতসাহিত করি।